রংপুরের রঘু বাজারে লোকপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ভাইরাল কাঠের সেতু’
ইট-পাথরের নগরায়ণ ও যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল ছাড়িয়ে প্রকৃতির কিছুটা শান্ত ছোঁয়া পেতে মানুষ এখন ছুটে যাচ্ছেন গ্রামবাংলায়। রংপুরের ঐতিহাসিক আদি শহর মাহিগঞ্জ থেকে সামান্য দূরে রঘু বাজার এলাকায় গড়ে ওঠা একটি সাধারণ কাঠের সেতুই এখন রংপুর মহানগরের নতুন আকর্ষণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন আলোকচিত্র ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানটি পরিচিতি পেয়েছে ‘ভাইরাল কাঠের সেতু’ নামে। প্রতিদিন বিকেলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ও মুহূর্তগুলোকে ফ্রেমবন্দি করতে এখানে ভিড় জমাচ্ছেন বিভিন্ন এলাকার নানা বয়সী দর্শনার্থী।সেতুটি রংপুর মহানগরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের রঘু বাজার এলাকার দক্ষিণ বকচি পুকুরের পাড় ও মেকুরা সংলগ্ন ছোট একটি খালের ওপর অবস্থিত। একপাশে সবুজে ঘেরা প্রাকৃতির ক্যানভাস, অন্যপাশে শান্ত জলাশয়—দুটোর মাঝখানে কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী সাঁকোর সমন্বয়ে এক অপরূপ পরিবেশ তৈরি করেছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রঘু বাজার ও আশপাশের এলাকার গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে প্রতিদিনের যাতায়াতের সুবিধার জন্য এই ছোট খালের ওপর কাঠের সেতুটি নির্মাণ করা হয়। তবে চারপাশের প্রাকৃতিক রূপ এতই মনোরম যে, কিছু দর্শনার্থী ও আলোকচিত্রগ্রাহক এর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার পর মুহূর্তেই তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।স্থানীয় সমাজ উন্নয়নকর্মী ও বাসিন্দা হারুন উর রশিদ সোহেল বলেন:"আমাদের এলাকার মানুষের সাধারণ পারাপারের জন্যই মূলত সেতুটি করা হয়েছিল। এটি আকারে ছোট হলেও, আশপাশের আবহ ও মেঠোপথের স্নিগ্ধ প্রকৃতি ছবি বা ভিডিওতে দারুণ ফুটে ওঠে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন নগর ও দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ এটি দেখতে আসছেন।"তরুণদের জন্য এটি ইতোমধ্যে পছন্দের আড্ডাস্থল হয়ে উঠেছে। বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসা ফাহিম মুরশেদ জানান, ফেসবুকে ভিডিও ও চমৎকার কিছু স্থিরচিত্র দেখে তারা বন্ধুদের নিয়ে সরাসরি দেখতে আসেন। পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলোয় কাঠের সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অনুভূতি একদম আলাদা।রঘু বাজার এলাকার এই মেকুরা কাঠের সেতুকে কেন্দ্র করে এলাকায় বাইরের মানুষের আনাগোনা যেমন বেড়েছে, তেমনি চাঙা হতে শুরু করেছে গ্রামীণ অর্থনীতিও। মাহিগঞ্জ সাতমাথা থেকে রঘু বাজার পর্যন্ত চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকদের দৈনন্দিন আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।দর্শনার্থীদের চাহিদা মেটাতে মাহিগঞ্জ ও রঘু বাজার যাওয়ার পথে আমতলা এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন নতুন দোকানপাট। বিশেষ করে কেটলির আদলে নির্মিত একটি দৃষ্টিনন্দন চায়ের দোকান এখন দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিকেলের ঘুরে বেড়ানো শেষে কেটলির চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া দর্শনার্থীদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।কাঠের সেতুটি মূলত একটি অস্থায়ী কাঠামো। প্রতিনিয়ত প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটায় এর ওপর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ পড়ছে কি না, তা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত স্থানীয় প্রবীণরা।তামপাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান আলী বলেন:"অস্থায়ীভাবে স্থানীয়দের সুবিধার্থে নির্মাণ করা সেতুটিতে অতিরিক্ত দর্শনার্থী ওঠার কারণে কাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যায়। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সেতুতে সতর্কতার সাথে চলাচল করা দর্শনার্থীদের নৈতিক দায়িত্ব।"পাশাপাশি স্থানীয়দের বড় একটি দাবি হলো মহানগরের বর্ধিত এই ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন। বর্ষাকালে এলাকাটির জলাবদ্ধতা নিরসন এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই যাতায়াতের জন্য সেতুটির স্থানে অথবা আশপাশে একটি স্থায়ী ব্রিজ বা বড় কালভার্ট নির্মাণের জন্য রংপুর সিটি করপোরেশনের নজরদারি দাবি করছেন এলাকাবাসী।যাতায়াত নির্দেশিকা রংপুর মূল শহরের যেকোনো স্থান থেকে প্রথমে অটোরিকশায় মাহিগঞ্জ বাজার বা মাহিগঞ্জ সাতমাথায় যেতে হবে। সেখান থেকে রঘু বাজার অভিমুখী ঝারবাড়ী সড়ক ধরে সামান্য এগোলেই মেকুরা/দক্ষিণ বকচি পুকুরের পাড় (কাঠের সেতু)।শাপলা চত্বর থেকে মাহিগঞ্জ পর্যন্ত অটোরিকশা ভাড়া আনুমানিক ১৫-২০ টাকা এবং মাহিগঞ্জ থেকে রঘু বাজার পর্যন্ত আরও ২০-৩০ টাকা।বিকেলের পড়ন্ত রোদে স্থানটি সবচেয়ে মনোরম রূপ ধারণ করে।