বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে সারা দেশের মতো রংপুরেও শুরু হয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা। প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে এবং বিশ্বকাপের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে রংপুরে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সমর্থকেরা আয়োজন করেছেন এক বর্ণাঢ্য আনন্দ র্যালি।আর্জেন্টিনার পতাকা, জার্সি, বাঁশির শব্দ এবং রং ছিটিয়ে উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে নগরীর বিভিন্ন সড়ক।সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে নগরীর টাউন হল চত্বর থেকে আর্জেন্টিনা ফ্যানস ক্লাব রংপুরের উদ্যোগে এই বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালি টাউন হল চত্বর থেকে শুরু হয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় একই স্থানে এসে শেষ হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন বয়সী ফুটবলপ্রেমী, কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে মধ্যবয়সীরাও।অনেকেই আর্জেন্টিনা দলের নীল-সাদা জার্সি পরে এবং জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বাঁশি বাজিয়ে এবং রং ছিটিয়ে সমর্থকেরা উচ্ছ্বাস তুলে ধরেন। পরে সেখানে বড় পর্দায় আর্জেন্টিনা দলের বিভিন্ন স্মরণীয় ম্যাচের ভিডিও ক্লিপ প্রদর্শন করা হয়। এতে উপস্থিত সমর্থকেরা দলটির অতীত সাফল্য স্মরণ করেন এবং বিশ্বকাপে দলের জন্য শুভকামনা জানান।আর্জেন্টিনা ফ্যানস ক্লাব রংপুরের অন্যতম সংগঠক ময়নুল হক বলেন, ‘ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনাকে ঘিরে আলাদা এক আবেগ কাজ করে।বিশ্বের অন্যতম গোছানো ও শৈল্পিক ফুটবল খেলা দল আর্জেন্টিনা। আমরা নানা আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় দলকে উৎসাহ দিতে চাই। একই সঙ্গে রংপুরে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের শক্তিশালী অবস্থানও তুলে ধরতে চাই।’তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান আর্জেন্টিনা দলে অনেক বিশ্বমানের খেলোয়াড় রয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দলটি ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে।বিশেষ করে লিওনেল মেসির নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণায় দলটির প্রতি আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আমরা বিশ্বাস করি, এবারও আর্জেন্টিনা শিরোপা জয়ের অন্যতম দাবিদার।’আর্জেন্টিনা সমর্থক এম এম কাদের বলেন, ‘আজকের আয়োজনের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছি। প্রিয় দলের সমর্থনে বন্ধুদের নিয়ে র্যালিতে অংশ নিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। বিশ্বকাপের আনন্দ সবাই মিলে ভাগাভাগি করাই আমাদের উদ্দেশ্য।’আর্জেন্টিনা সমর্থক রিয়াজুজ্জামান হৃদয় বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। বিশ্বকাপ এলেই আমরা দলকে সমর্থন জানাতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিই। এমন আয়োজন আমাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’সমর্থক জায়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমি আর্জেন্টিনা দলের খেলা দেখতে পছন্দ করি। তাদের ফুটবলের ধরন আমার ভালো লাগে। তাই মন থেকে দলটিকে সমর্থন করি। র্যালিতে অংশ নিয়ে অনেক আনন্দ পেয়েছি।’ ছবি: সংগৃহীতআর্জেন্টিনা ফ্যানস ক্লাব রংপুরের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ায় সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রিয় দল আর্জেন্টিনা এবারও বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, দলটি ভালো খেলবে এবং শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে শক্ত অবস্থানে থাকবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের র্যালি ও শোভাযাত্রার অংশ হিসেবেই রংপুরে এ আয়োজন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা। আমরা চাই খেলাকে কেন্দ্র করে সবাই আনন্দ করবে এবং সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ বজায় থাকবে।’আর্জেন্টিনা ফ্যানস ক্লাব রংপুরের সভাপতি এবং মহানগর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহির আলম নয়ন বলেন, ‘আমাদের প্রিয় দেশ বাংলাদেশ। আমরা কোনো দেশের রাজনীতি বা অন্য কিছু নয়, শুধুমাত্র একটি ফুটবল দলকে সমর্থন করি। সেই ভালোবাসা থেকেই আজকের এই বর্ণাঢ্য র্যালি ও আনন্দ-উল্লাসের আয়োজন।’তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আর্জেন্টিনা এবং লিওনেল মেসির ভক্ত হলেও অন্য কোনো দলের প্রতি আমাদের কোনো বিদ্বেষ নেই। আমরা চাই সবাই মিলে বিশ্বকাপ উপভোগ করুক। ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা, তবে আমাদের বিশ্বাস আর্জেন্টিনা এবারও শিরোপা জয়ের অন্যতম দাবিদার হবে।’র্যালি ঘিরে নগরীতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পথচারী ও সাধারণ মানুষও কিছু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে আনন্দ উপভোগ করেন। বিশ্বকাপকে ঘিরে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। সমর্থকদের প্রত্যাশা, মাঠের খেলায়ও তাদের প্রিয় দল সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করবে।
অনলাইন জরিপ
রংপুরের ঐতিহ্য আর গৌরবের প্রতীক, জিআই পণ্য ‘হাঁড়িভাঙা’ আমের আনুষ্ঠানিক বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকায় বাগানে আম পেড়ে এই মৌসুমের বিক্রয় কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন।উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে পদাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আমচাষি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন জেলা প্রশাসক। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি হাঁড়িভাঙা আমকে জেলা প্রশাসনের ‘অগ্রাধিকার প্রকল্প’ হিসেবে ঘোষণা করেন। চাষিরা এসময় আম সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ, যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, ব্যাংকিং সুবিধা বৃদ্ধি, হাটে স্থায়ী শেড ও ওয়াশ ব্লক স্থাপন এবং বিদেশে আম রফতানির সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানান।চাষিদের দাবির প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিয়ে বলেন, “হাঁড়িভাঙা আমের বিশ্ববাজার ধরতে এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্রুত সড়ক সংস্কার, ব্যাংকের শাখা স্থাপন এবং আম পরিবহনের জন্য ‘ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন’ চালুসহ সব সমস্যার সমাধানে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।”উদ্বোধনের প্রথম দিনেই পদাগঞ্জ হাটে প্রচুর আমের সরবরাহ দেখা গেছে। তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টির কারণে কেনাবেচায় কিছুটা ধীরগতি থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে বাজার। বর্তমানে প্রতি মণ হাঁড়িভাঙা আম মানভেদে ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।ফলন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াচলতি মৌসুমে শিলাবৃষ্টির কারণে আমের ফলন প্রায় ৩০ শতাংশ কম হলেও আমের আকার বেশ বড় হয়েছে। কৃষকরা জানান, ফলন কম হওয়ায় দাম আশানুরূপ না পেলে তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তবে কৃষি বিভাগ আশার বাণী শুনিয়েছে। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সিরাজুল ইসলাম জানান, ফলন কিছুটা কম হলেও আমের গুণগত মান ও আকার ভালো হয়েছে। শুরুতে দাম কিছুটা কম মনে হলেও দিন বাড়ার সাথে সাথে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।ঐতিহ্যবাহী এই আমের বাজারজাতকরণ শুরু হওয়ায় রংপুরের আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন ব্যস্ততা আর উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
ক্রমাগত লোকসানের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন দেশের কৃষকরা। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলেও ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।পীরগঞ্জের কৃষক শাফি মন্ডল জানান, এক বিঘা জমিতে মরিচ চাষের জন্য তিনি ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। আশা ছিল মরিচ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবেন এবং সংসারের খরচ মেটাবেন। কিন্তু বাজারে মরিচের দাম কম থাকায় বিক্রি করে উৎপাদন খরচের অর্ধেক টাকাও তুলতে পারেননি।তিনি আরও জানান, মরিচ চাষে লোকসানের পর বেঁচে থাকার তাগিদে অন্য জমিতে ধান চাষ করেন। ধান কাটার পর ঋণ পরিশোধের জন্য বাধ্য হয়ে মৌসুমেই মাত্র ৭৫০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে, চাষ করা মরিচ বর্তমানে মাত্র ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কৃষকটির ভাষ্য, “আমরা আর বাঁচবো না। কৃষক মরে শেষ হয়ে যাব। আমাদের দেখার কেউ নেই।”কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না হলে কৃষি খাত আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের মতে, লোকসান ও ঋণের চাপ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অনেকেই কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারেন।
দেশের ঐতিহ্যবাহি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম আগামী ২০ জুন থেকে বাজারে আসা শুরু হবে। দেশে উৎপাদিত একমাত্র আঁশবিহিন সুস্বাদু এই ফল দেশে উৎপাদিত সব আমের সেরা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এবারেও আম পুষ্ট হবার আগেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে ২৫ কোটি টাকারও বেশি আমের রপ্তানি অর্ডার পেয়েছেন বাগান মালিকরা।তবে এবার বৈশাখ মাস জুড়ে অবিরাম বৃষ্টি আর ঝড়ের কারণে ফলন কম হবার আশঙ্কা করছেন আমচাষিরা। তারা বলছেন, এবারের বৈরী আবহাওয়া, বৃষ্টি, ঝড়সহ নানা প্রতিকূলতার কারণে ফলন ভালো হচ্ছে না।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর রংপুরে ২ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে।যা গত বছরের চেয়ে ২শ হেক্টর বেশি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পরেও ৩০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের আশা করছেন বাগান মালিক ও চাষিরা। যাতে অন্তত ২শ কোটি টাকার আম তারা বিক্রি করতে পারবেন।এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, হাঁড়িভাঙ্গা আম পুরোপুরি পুষ্ট হতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আমের চেয়ে বেশি সময় লাগে।ফলে আগামী ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এবারে হাঁড়িভাঙ্গা আমের আকার অন্যান্য বারের চেয়ে কাঙ্ক্ষিত হয়েছে।ন্যায্য মূল্য পেলে আমচাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা করছেন। তাছাড়া অন্যান্য বারের চেয়ে এবারে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাহিদা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেশি হবে বলে আশা করছেন আম ব্যবসায়ীরা।হাঁড়িভাঙ্গার ইতিহাসরংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লালমাটি বলে পরিচিত পদাগঞ্জ এলাকায় হাঁড়িভাঙ্গা আম প্রথম উৎপাদন করেন সালাম নামের এক চাষি।সম্পূর্ণ আঁশমুক্ত আর দারুণ সুস্বাদু হওয়ায় আমটির চাহিদা এখন উত্তরাঞ্চল আর দেশ ছাপিয়ে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে।প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার আম রপ্তানি করছেন চাষিরা।ফলে বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর, পদাগঞ্জ, কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট সর্দ্দারপাড়া, সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করণী ইউনিয়নের কাঁটাবাড়ি, পাশের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই এখন গড়ে উঠেছে হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাণিজ্যিক বাগান।মূলত, লালমাটি এলাকায় হাঁড়িভাঙ্গা আমের যেমন ভালো ফলন হয়, তেমনি অনেক বেশি সুস্বাদুও। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবার নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠেছে।আমচাষিরা বলছেন, বৈশাখ মাস জুড়ে অবিরাম ঝড়-বৃষ্টির কারণে আমের অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে।ক্ষুদ্র চাষিদের অভিযোগ, আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে তারা আরও বেশি লাভবান হতে পারতেন।আমচাষিদের অভিযোগ, বড় বড় ব্যবসায়ী আগাম টাকা দিয়ে আমের বাগান কিনে নেয়ায় তারা লাভবান হচ্ছেন বেশি।এভাবেই হাঁড়িভাঙ্গা আম বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার অন্তত ৯০টি গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে। এই আম চাষ করে হাজার হাজার পরিবার এখন একেবারেই স্বাবলম্বি।সরেজমিনে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার পদাগঞ্জ ও খোড়াগাছ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি বাগান ছাড়াও প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে ১০-১৫টি হাঁড়িভাঙ্গা আমের গাছ। আবার কোনো কোনো বাড়ি ঘিরে শুধুই আমগাছ। আম পাকা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। একই এলাকার আমচাষি মনোয়ার হোসেন, রহমত আলী, আয়েশা বেগমসহ অনেকেই জানালেন, ১০ বছর আগেও এসব এলাকা ছিলো অভাবী মানুষে ভরা। এখন সেই অভাব দূর হয়েছে। সচ্ছলতা এসেছে ঘরে ঘরে।এক সময় তিন বেলা তো দূরের কথা এক বেলা খাবারও জুটতো না।মাটি লাল হওয়ায় বছরে একবার মাত্র ধান উৎপাদন হতো। বাকি ৮ মাস পতিত পড়ে থাকতো। তবে হাঁড়িভাঙ্গা আম এসে তাদের ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছে। এখন এক ফসলি ধানী জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক আম বাগান।বছরে আম বিক্রি করে সবার সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, ভূমিহীন পরিবারগুলো তাদের বাস্তুভিটাতেই হাঁড়িভাঙ্গা আম গাছ লাগিয়ে উৎপাদিত আম বিক্রি করে সচ্ছলতা এনেছেন।তবে চাষিদের সবার দাবি একটাই, আম সংরক্ষণে ব্যবস্থা করা। কারণ সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় পানির দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হন।এ ব্যাপারে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ দাবি করছেন চাষিরা।হাঁড়িভাঙ্গা আমের সবচেয়ে বড় বাগান মালিক রমজান আলী জানান, ঢাকা থেকে বেশ কয়েকজন আড়তদার এবার অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং করছেন। তার মতো আরও অন্তত ৪০টি বাগান মালিকদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আপাতত ২০ কোটি টাকার আমের অর্ডার মিলেছে। তবে রপ্তানি এবার ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা চাষিদের।একই কথা বললেন আমচাষি রবিউল ইসলাম।রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন জানান, সরাসরি বাগান থেকে যাতে আম কিনতে পারা যায়, সেজন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। টাকা লেনদেনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ খোলা হবে। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর নজরদারিও বাড়ানো হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম পৌঁছে দেওয়ার জন্য জনপ্রিয় কুরিয়ার সার্ভিসগুলো পদাগঞ্জ এলাকায় বিশেষ অফিস স্থাপন করেছে।তারা বাগান থেকে আম সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা রেখেছে।জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, কৃষিবিভাগসহ সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে আগামী ২০ জুন থেকে হাঁড়িভাঙ্গা আম বিক্রি করার সময় নির্ধারণ করে দিয়েছি।রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, এবার অবিরাম ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও তা অস্বাভাবিক নয়। এতে ততবেশি ক্ষতি হবে না বলেও মনে করছেন হাবিবুর রহমান।রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিপণন বিভাগের উপ-পরিচালক সিফাত জাহান জানান, হাঁড়িভাঙ্গা আম রংপুরের ঐতিহ্যকে আরো বেশি করে দেশে বিদেশে পরিচিত করেছে। এবার আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে ফলন একটু কম হলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। আশা করা যায়, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩০ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবার চাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা করা যায়।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা আলমপুর পাইকপাড়া গ্রামে একটি পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে বিপুল পরিমাণ মাছ মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।ভুক্তভোগী পরিবার ও থানা সূত্রে জানা যায়, পাইকপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে ইব্রাহীম তাঁর বাড়ির পাশের একটি পুকুরে দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষ করে আসছিলেন। গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) দিবাগত রাতের কোনো এক সময়ে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা শত্রুতা করে তাঁর পুকুরের পানিতে বিষ প্রয়োগ করে।পরের দিন শুক্রবার (৫ জুন) সকালে ইব্রাহীম পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখতে পান শত শত মরা মাছ পানিতে ভেসে রয়েছে। এতে তাঁর বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।এই ঘটনায় ক্ষোভে ও ক্ষয়ক্ষতিতে ভেঙে পড়েছেন মাছ চাষি ইব্রাহীম। এ বিষয়ে জড়িতদের বিচার দাবি করে তিনি বাদী হয়ে তারাগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে তারাগঞ্জ থানার এএসআই আশরাফুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লিচুর রাজ্যখ্যাত দিনাজপুরে জমে উঠেছে বেচাকেনা। বাজারে এসেছে মাদ্রাজি, বেদানা, বোম্বাই ও চায়না-থ্রি জাতের লিচু। বর্তমানে ১০০ লিচু সর্বনিম্ন ২৫০ ও সর্বোচ্চ ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।তবে ঈদের কারণে শহর ছেড়ে মানুষ গ্রামে ফেরায় এবং পণ্যবাহী যানাবাহন বন্ধ থাকায় গতবারের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই সময় লিচু সর্বনিম্ন দাম ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল।চাষিরা বলছেন, দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, অন্য বছরের তুলনায় এবার দাম অনেক কম। ক্রেতারাও বলছেন, গতবারের চেয়ে এখন পর্যন্ত দাম অনেক কম। তবে আজ থেকে পণ্যবাহী পরিবহন, কুরিয়ার সার্ভিসের বুকিং শুরু হওয়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা আসতে শুরু করেছেন। ফলে দুই একদিনের মধ্যে লিচুর দাম বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।কৃষি বিভাগ জানায়, জেলায় পাঁচ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে পাঁচ হাজার ৪১৮টি। এর মধ্যে বোম্বাই লিচু তিন হাজার ১৭০ হেক্টর, মাদ্রাজি এক হাজার ১৬৬ হেক্টর, চায়না-থ্রি ৮০২ হেক্টর, বেদানা ২৯৫ দশমিক ৫ হেক্টর, কাঁঠালি ৫৬ হেক্টর ও মোজাফফরপুরী ১ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। পাশাপাশি বসতবাড়ির উঠান ও বাগানসহ লিচুগাছ আছে প্রায় সাত লাখ। এবার লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন।গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৩০ হাজার মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। তবে এবার লিচুর ফলন কিছুটা কম।জেলার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার শহরের কোতোয়ালি থানার নিকটবর্তী নিউমার্কেট। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এ বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় থাকে।সোমবার (১ জুন) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, একদিকে চলছে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক। অপরদিকে চলছে দর-কষাকষি। বাজারে মাদ্রাজি, বেদানা ও বোম্বাই জাতের লিচু বেশি দেখা গেলেও খুচরা বাজারে অল্প পরিমাণ দেখা মিলেছে বেদানা ও চায়না-থ্রি লিচু। বাজারের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ভ্যান ও ইজিবাইকে লিচু নিয়ে বিক্রির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন চাষি ও বাগানিরা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইকারিতে মাদ্রাজি লিচুর হাজার বিক্রি হচ্ছে ১৮০০-২০০০ টাকা। বেদানার হাজার ৩৫০০ টাকা থেকে ৬০০০ হাজার, চায়না থ্রি সাত-আট হাজার এবং বোম্বাই ২২০০-২৫০০ টাকা।লিচু ব্যবসায়ী দরদী ফল ভান্ডরের সত্ত্বাধিকারী মো. রানা বলেন, বৃষ্টি ও রোদের কারণে লিচুর সাইজ ও রং অনেক ভালো হয়েছে। মাদ্রাজী ১৮০০-২০০০ টাকা হাজার, চায়না থ্রি সাত-আট হাজার এবং বোম্বাই ২২০০-২৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।মামুন ফল ভান্ডারের সত্ত্বাধিকারী ও আড়ৎদার মো. মামুন বলেন, মার্কেটে জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় খুব কষ্টে আছি। পৌরসভা যেন সহায়তা করে।ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, ব্যাপক লিচু আমদানি হওয়ায় দাম কম। বাগান থেকে মোম্বাই লিচু নিয়ে এনেছি ২৪০০ করে হাজার, এখানে দিলাম ২০০ টাকা লসে ২২০০ করে। গতকাল দাম ভালোই ছিল।বিরল উপজেলার কামদেবপুর থেকে আসা মিজানুর রহমান বলেন, নিউ মার্কেট মাদ্রাজী লিচু নিয়ে প্রায় ২ ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। কখন আড়তে পৌঁছে বিক্রি করবো আল্লাহ জানে।সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা থেকে আসা সজীব হাসান বলেন, লিচু বিক্রির জন্য প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আর কতক্ষণ লাগবে বলা মুশকিল। লিচুর দাম পাবো কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।নিউমার্কেটে লিচু কিনতে এসেছেন মুশফিকুর রহমান। তিনি দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা হলেও চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। দুপুর ২টার গাড়িতে ঢাকায় যাবেন লিচু নিয়ে। বেদানা লিচু ৫০০ এবং চায়না থ্রি ৮০০ টাকা শ হিসেবে কিনলেন। দাম কম পেয়ে খুশি বলে জানালেন।দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসার অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, এবার লিচুর ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তবে এবার লিচুর আকার, সাইজ ও রং ভালো। কেবল বাজার শুরু হয়েছে। চাষিরা দাম ভালো পাবেন আশা করছি।
রংপুর নগরবাসীর জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত মাংস সরবরাহ নিশ্চিত করতে আধুনিক কসাইখানা (স্লটার হাউস) নির্মাণ করেছে সিটি করপোরেশন। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নগরীর ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কসাইখানাটি এখন উদ্বোধনের প্রহর গুনছে। বর্তমানে এখানে পরীক্ষামূলকভাবে পশু জবাই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, এই কসাইখানায় পশু জবাইয়ের জন্য রয়েছে পৃথক ইউনিট ও উন্নত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। এছাড়া মাংসের গুণমান ঠিক রাখতে জীবাণুনাশক সুবিধা, স্বাস্থ্যসম্মত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে পশু জবাইয়ের আগে বিশেষজ্ঞ দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা হবে, ফলে অসুস্থ পশুর মাংস বাজারে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না।মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে নবনির্মিত এই প্রকল্প পরিদর্শন করেন রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন। তিনি বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে দেখেন এবং কাজের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,"পরীক্ষামূলকভাবে পশু জবাই শুরু হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগ ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে অতিদ্রুত এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।"অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে পশু জবাই ও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর করতে এই প্রকল্প বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নাজমুল হুদা জানান, উন্নত দেশের মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাংস প্রক্রিয়াজাত করা গেলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নগরবাসী। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল রহমান বলেন, "খোলা স্থানে জবাইয়ের ফলে যে দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণ হতো, আধুনিক কসাইখানা চালু হলে তা বন্ধ হবে।" রাশেদা বেগম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, "নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আমরা এখন অনেক সচেতন। এমন ব্যবস্থা চালু হলে আমরা নিশ্চিন্তে মাংস কিনতে পারব।"