জুলাই আন্দোলনে রংপুরে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষকসহ ১১ জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সিন্ডিকেট সভার সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের আদেশের কপি পাওয়ার পর তা সভায় উপস্থাপন করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্টদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এর আগে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের ১২৩তম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।বহিষ্কৃত তিন শিক্ষক হলেন গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল আসাদ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম। মশিউর রহমান ও আসাদুজ্জামান মন্ডল আসাদ পলাতক রয়েছেন এবং সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম কারাগারে রয়েছে।বহিষ্কৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হলেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, তৎকালীন সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান তুফান, সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, নিরাপত্তাকর্মী নূর আলম মিয়া, কর্মচারী আনোয়ার পারবেজ আপেল এবং এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. শওকাত আলী বলেন, শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আদেশের কপি আমরা গত পরশুদিন পেয়েছি। কপি পাওয়ার পর বিষয়টি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হয়। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত।গত ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তারা দুজনই গ্রেপ্তার আছেন। তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, আর বাকি আসামিদের দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদের সাজা।পলাতক অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশিদ, সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান, দুই শিক্ষক মশিউর রহমান ও আসাদুজ্জামান এবং ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে, নিরস্ত্র একজন শিক্ষার্থীর ওপর পুলিশের বর্বরোচিত গুলির ঘটনায় শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনের দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। তারা আবু সাঈদকে রক্ষায় এগিয়ে না এসে উল্টো আক্রমণকারীদের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন, যা আইন ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।
অনলাইন জরিপ
গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখেছেন দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার সিট আলোকডিহি গ্রামের কৃষক ময়েজ উদ্দিন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় দিনাজপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলতি মৌসুমে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের শিম চাষ করে লাভের সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।আজ বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ময়েজ উদ্দিনের ২০ শতক জমির শিমখেত ফুল ও ফলে ভরে উঠেছে। মাচাজুড়ে ঝুলছে কচি শিম। পরিচর্যা, শিম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ময়েজ উদ্দিন।ময়েজ উদ্দিনের শিম চাষ দেখে একই এলাকার অন্য কৃষকরাও গ্রীষ্মকালীন শিম চাষে আগ্রহী হয়েছেন। তাঁর সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে কৃষক কায়েসসহ ওই এলাকার আরও কয়েকজন কৃষক চলতি মৌসুমে শিম চাষ করেছেন। এতে এলাকায় গ্রীষ্মকালীন শিম চাষের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে বিকল্প ও লাভজনক সবজি চাষে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।কৃষক ময়েজ উদ্দিন জানান, প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি বিকল্প ও লাভজনক ফসল চাষের চিন্তা থেকেই তিনি গ্রীষ্মকালীন শিম চাষে আগ্রহী হন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও প্রকল্পের সহযোগিতায় ২০ শতক জমিতে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের শিম চাষ শুরু করেন। গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে শিমের ভালো ফলন ও তুলনামূলক ভালো বাজারদর পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। ভবিষ্যতে আরও জমিতে এ জাতের শিম চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।ময়েজ জানান, ‘২০ শতক জমিতে শিম চাষে এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বর্তমান ফলনের ধারাবাহিকতায় প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করার আশা করছেন তিনি। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি শিম ১১০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে তাঁর প্রায় ৩৫ থেকে ৪২ হাজার টাকা লাভ হতে পারে।’উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল বিন আমিন বলেন, ময়েজ উদ্দিনের শিমখেতে নিয়মিত পরিচর্যা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতটি গ্রীষ্মকালীন সময়ে চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় কৃষকের ভালো ফলন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে কম খরচে বেশি উৎপাদন ও লাভ করতে পারেন।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইয়াসমিন আক্তার বলেন, জলবায়ু ও মৌসুমভেদে ফসলের বৈচিত্র্য আনা এবং একই জমিতে অধিকতর লাভজনক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত জাত সম্পর্কে উৎসাহিত করা হচ্ছে। গ্রীষ্মকালীন শিম চাষের মতো উদ্যোগ কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহ বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে।
বাজারে নতুন আলুর চড়া দামের আশায় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে আগাম আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। শীত আসার আগেই নতুন আলু বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় আমন ধান কাটার পরপরই উঁচু জমিতে আলু রোপণ শুরু করেছেন তারা। গত মৌসুমে আলুর দাম কম থাকায় লোকসান গুনতে হয়েছে অনেক কৃষককে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার অনুকূল আবহাওয়া, তুলনামূলক বীজের দাম ও সারের স্বাভাবিক সরবরাহকে কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই মাঠে নেমেছেন কৃষকেরা। কিশোরগঞ্জ উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই আগাম আলু চাষের জন্য পরিচিত। এঅঞ্চলের কৃষকেরা শীতের আগেই আলু বাজারে তুলে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করেন।কৃষকেরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগাম আলু প্রতি কেজি ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় সেভেন জাতের আলু রোপণের ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যেই তোলা যায়। বাজারে নতুন আলুর চাহিদা ও দাম তুলনামূলক বেশি থাকায় আগাম আলু চাষে কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে।সরেজমিনে দেখা যায়, বাহাগিলী, নিতাই, পুটিমারী, গাড়াগ্রাম ও রণচণ্ডীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠে আগাম আমন ধান কাটার পরপরই জমি প্রস্তুত করে আলু রোপণ করছেন কৃষকেরা। কেউ আলু রোপণ শেষ করেছেন, আবার কেউ জমি প্রস্তুত করছেন। ফলে মাঠে বেড়েছে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততা। বেড়েছে শ্রমিকের চাহিদা ও মজুরিও।বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি এবার ৫০ শতাংশ জমিতে আগাম আলু রোপণ করছি। জমি ইজারা, হালচাষ, শ্রমিক ও কৃষি উপকরণসহ আলু তোলা পর্যন্ত প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। বাজারদর ভালো থাকলে প্রতি কেজি আলু ৯০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে। একই এলাকার কৃষক এজাজুল ইসলাম বলেন, গত বছর বিঘাপ্রতি বেশ লোকসান হয়েছে। এবার সেই লোকসানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগাম আলু চাষ করছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ভালো ফলন ও চড়া দাম পাওয়ার আশা করছি। পুটিমারী ইউনিয়নের কৃষক মনছুর আলী বলেন, প্রতি বছরই আমাদের উপজেলায় আগাম আলু চাষ হয়। আমি এবার দুই বিঘা জমিতে আলু রোপণ করেছি। হিমাগার থেকে আলু এনে বীজ হিসেবে ব্যবহার করেছি। খরচ কিছুটা বেশি হয়েছে। তবে ভালো দাম পেলে লাভ হবে। এবিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকেরা ভালো বাজারদর পেয়ে লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় ৫ হাজার ৮৯০ জন কৃষকের মাঝে প্রায় ৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার কৃষি ঋণ মওকুফের সনদপত্র বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যেক কৃষকের হাতে পাঁচটি করে মোট ২৯ হাজার ৪৫০টি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়। ব্যতিক্রমধর্মী এ আয়োজনকে ঘিরে কৃষকদের মাঝে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।রোববার (১৯ জুলাই) দুপুরে বোদা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বোদা মডেল পাইলট সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে কৃষি ঋণ মওকুফ সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে কয়েক হাজার কৃষক অংশগ্রহণ করেন।অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে স্থানীয় শিল্পীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং রাজশাহী থেকে আগত শিল্পীদের গম্ভীরা পরিবেশনের মাধ্যমে কৃষকবান্ধব বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরা হয়।জেলা প্রশাসক মোসাঃ শুকরিয়া পারভীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার আবু সাইম, বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহেমদ রাশেদ উন নবী এবং বোদা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দিল রেজা ফেরদৌস চিন্ময়সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা।প্রধান অতিথি অনুষ্ঠানে ৫ হাজার ৮৯০ জন কৃষকের হাতে প্রায় ৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার কৃষি ঋণ মওকুফের সনদ তুলে দেন। পাশাপাশি প্রত্যেক কৃষককে পাঁচটি করে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা প্রদান করা হয়। সব মিলিয়ে ২৯ হাজার ৪৫০টি গাছের চারা বিতরণ করা হয়।অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে কৃষকদের অংশগ্রহণে হাঁস ধরা, কলাগাছ খেলা, দড়ি টানাটানিসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনে অংশ নিয়ে কৃষকরা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগে উপস্থিত কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।
রংপুরের ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারে এসেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও জুনের মাঝামাঝি সময়ে এই রসালো ও সুস্বাদু আমের আনুষ্ঠানিক বিক্রি শুরু হয়েছে।সোমবার (১৫ জুন) থেকে সরকারিভাবে রংপুরের বিখ্যাত হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারজাতকরণ শুরু হয়। প্রথম দিনেই রংপুরের বিখ্যাত আম বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল পদাগঞ্জ হাটসহ বিভিন্ন বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।আমবাগানের মালিক, আমের ফড়িয়া, বাগানের পরিচর্যায় নিয়োজিত ব্যক্তি, মৌসুমি আম বিক্রেতা, অনলাইনে আম বিক্রেতা, পরিবহন ব্যবসায়ী, কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসায়ী সবাই যে যার মতো করে আম কেনা-বেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পরিপক্ব হওয়ার আগেই এক সপ্তাহ আগে থেকেই এই আম বিক্রি শুরু করেছেন।চাষি ও স্থানীয় পাইকারি বিক্রেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মান ও আকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মণ বড় সাইজের আমের দাম এখন ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা এবং মাঝারি সাইজের প্রতি মণ আম ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ পাইকারি মূল্যে প্রতি কেজি আমের দাম পড়ছে ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা।তবে খুচরা বাজারে বড় সাইজের আম বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, আর মাঝারি সাইজের আম বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত।স্থানীয় আমচাষি মেহেদী হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিজস্ব পাঁচ বিঘা জমিতে এবার আম চাষ করেছেন। টানা বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে ফলন কম হয়েছে। সেইসঙ্গে আমের গায়ের কালারও পরিবর্তন হয়েছে। গত বছর শুরুতে যে আমের মণ ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত ছিল, এবার সেই আমের দাম কমে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি মোসাব্বির বকসি বলেন, ৮ একর জমিতে আমের চাষ করেছি। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে বাগানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। এখন যে দামে বিক্রি হচ্ছে তাতে আশানুরূপ লাভ হবে না। তবে দিন গড়ালে দাম আরও বাড়তে পারে।’ঢাকা থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘রংপুরের মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে ট্রাকে করে চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। শুধু তাই নয়, কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর পাশাপাশি এবারও অনলাইনে হাঁড়িভাঙ্গা আম বিক্রির ধুম পড়েছে। ফেসবুক পেজ ও ই-কমার্স সাইটগুলোর মাধ্যমে ঘরে বসেই ক্রেতারা একদম তাজা আম পেয়ে যাচ্ছেন।কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠানো প্রতি কেজি আমের খরচ ১৩ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ১৬ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ক্যারেট/বক্স, প্যাকিং খরচসহ এক মণ আম পাঠাতে ৩৬০০ থেকে ৪০০০ টাকা খরচ পড়ছে। এদিকে রংপুর নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সড়ক, সিটি বাজার, লালবাগ, মডার্ন মোড়, ধাপ বাজার, শাপলা চত্বরসহ নগরীর বিভিন্ন হাট-বাজারেও মিলছে এই আম। হাট-বাজার ছাড়াও পাড়ামহল্লার অলিগলিতে ফেরি করে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করতে দেখা গেছে।স্থানীয়রা বলেন, সরকারি উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ জুন থেকে আম বাজারজাত শুরু হয়েছে। কিন্তু এই আম পরিপক্ব না হতেই এক সপ্তাহ আগে থেকে অনেকেই বাড়তি লাভের আশায় বাগান থেকে পেরে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো শুরু করেছেন।পদাগঞ্জ এলাকার মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমের কারণে এবার আগেভাগেই আম পাড়া শুরু হয়েছে। তবে কেউ কেউ আম পাকাতে স্প্রে মেশাচ্ছেন। যদিও এটা করা অন্যায় এবং এতে হাঁড়িভাঙা আমের প্রকৃত স্বাদ থাকছে না।’পাইকারি ব্যবসায়ী আলম মিয়া বলেন, ‘বাগানে আম পরিপক্ব হয়েছে। বাগান মালিকরা তাকে ডেকে আম বিক্রির কথা বলেন। তাই এক সপ্তাহ আগ থেকেই তাদের কাছ থেকে তিনি আম কিনে বিক্রি শুরু করছেন।’কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার রংপুর জেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা আম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০০ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে হাঁড়িভাঙা আমের ফলন হয় প্রায় ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন। সব কিছু ঠিক থাকলে ২০০ কোটি টাকার ওপরে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হবে বলে।কৃষি সম্প্রসারণ রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শিলাবৃষ্টিতে হাঁড়িভাঙা ঝড়ে পড়লেও ফলন ভালো হয়েছে। আকারেও বড় হয়েছে। তাই কৃষকরা পুষিয়ে উঠতে পারবেন বলে আশা করা যায়।’হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারজাতকরণের উদ্বোধনী দিনে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘হাড়িভাঙ্গা আমের জন্য পদাগঞ্জ বাজার অন্যতম বাণিজ্যিক জায়গা। তবে এটার অবকাঠামোগত কিছু অসুবিধা আছে। এই অসুবিধাগুলো দূর করার জন্য তিন বছর মেয়াদি অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনা নিয়েছি। এই হাটটাকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায় এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ কীভাবে লাঘব করা যায়- সে বিষয়ে কাজ করছি। এছাড়াও রপ্তানির প্রতিবন্ধকতাগুলোও সমাধানের চেষ্টা করছি।’উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। হাঁড়িভাঙা আম এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই আম রপ্তানি করা হয়। দেশের ভেতরে ফেসবুক ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহের হার গত কয়েক বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে।
“করবো মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করবো বারো মাস”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় ৩ দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পলাশবাড়ীর আয়োজনে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ ফল মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলায় দেশীয় বিভিন্ন মৌসুমি ফল, উন্নত জাতের ফলের চারা, আধুনিক ফল উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন সোহেলের সভাপতিত্বে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের আহম্মেদ।প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও শেখ জাবের আহম্মেদ বলেন:“ফল চাষের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের ঘাটতি পূরণে আমাদের দেশীয় ফলের ভূমিকা অপরিসীম।”তিনি মেলায় আগত সকলকে এবং উপজেলার সর্বস্তরের জনগণকে যার যার বসতবাড়ি ও পতিত জমিতে বিভিন্ন জাতের পুষ্টিকর ও লাভজনক ফলদ গাছ রোপণের উদাত্ত আহ্বান জানান।ছবি: সংগৃহীতঅনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নকিবুল হাসান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আঞ্জুমান আরা গোলেনুর, উপজেলা জামায়াতের আমির আবু বক্কর সিদ্দিক এবং পলাশবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত চন্দ্র প্রামানিক।এছাড়াও মেলা প্রাঙ্গণে কৃষি অফিসের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপজেলার দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৃষক-কৃষাণী, স্কুলের শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।মেলা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত সফল কৃষকরা তাদের নিজেদের বাগানে উৎপাদিত নানা প্রজাতির ও হরেক রকমের মৌসুমি ফল স্টলে প্রদর্শন করছেন।উপজেলা কৃষি অফিস তথা আয়োজকরা জানান, ফল চাষে স্থানীয় কৃষকদের আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করা, সাধারণ মানুষের মাঝে পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে ফল সংরক্ষণ ও সঠিক বাজারজাতকরণ বিষয়ে সম্যক ধারণা দেওয়াই এই মেলার মূল উদ্দেশ্য। আগামী তিন দিন এই মেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশীয় ফলের যত বিলুপ্ত প্রজাতি রয়েছে, সেগুলো কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) খামারবাড়ির বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট (কেআইবি) চত্বরে তিন দিনব্যাপী (১৮-২০ জুন) জাতীয় ফল মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।এর আগে তিনি পুরো মেলা ঘুরে দেশীয় বিভিন্ন ফলের সঙ্গে পরিচিত হন এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।কৃষিমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর দেশে ফল মেলার উৎসব হয়। এ মেলার মাধ্যমে ফল উৎপাদনে বিপ্লব ঘটেছে। দেশীয় ফলের যত বিলুপ্ত প্রজাতি রয়েছে, সেগুলো ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।কৃষিমন্ত্রী বলেন, একই সঙ্গে বিদেশ থেকে যেসব ফল আমদানি করা হতো, সেসব ফলের জাতের জিন এনে দেশে চাষাবাদের মাধ্যমে অনন্য বিপ্লব ঘটানো হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে আমাদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা হচ্ছে।ড্রাগন ফলের উদাহরণ দিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিদেশের তুলনায় আমাদের উৎপাদিত ড্রাগন ফল সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এ ফলের উদ্ভাবনী কাজে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।চলতি অর্থবছরে কৃষিতে বাজেট বেড়েছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, গত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। এর বাইরে উন্নয়ন ও প্রণোদনা বাজেট বেড়েছে গত অর্থবছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ। তাই কৃষিতে বাজেট কমেছে কথাটি সঠিক নয় বলে জানান মন্ত্রী।