দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, নন্দিনী হত্যা মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। তিনি এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এমন নির্মম ঘটনার জন্য শোক ও ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা নেই।বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে নিহত শিশু নন্দিনীর বাড়ি পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।ত্রাণমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী বাজেট অধিবেশনে অবস্থান করেই নন্দিনীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার তিনজন সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছেন।তিনি বলেন, এ ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানা গেছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুত চার্জশিট দাখিল করা হবে। তিনি আরও বলেন, যারা একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করতে পারে তারা মানুষ নয়, নরপিশাচ। তাদের এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।এ সময় সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আসামিদের গ্রেফতারের পর শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে কারা উসকানি দিয়ে প্রশাসনের ওপর হামলা চালিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আরেকটি গুরুতর অপরাধ। যারা প্রশাসনের কাজে বাধা দিয়েছে, হামলা চালিয়েছে কিংবা সংঘবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, সাধারণ নিরীহ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে যারা অপরাধে জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।এ সময় উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুল, লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধান, জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, জেলা পরিষদ প্রশাসক একেএম মমিনুল হকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অনলাইন জরিপ
“করবো মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করবো বারো মাস”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় ৩ দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে উপজেলা পরিষদ চত্বরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পলাশবাড়ীর আয়োজনে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ ফল মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলায় দেশীয় বিভিন্ন মৌসুমি ফল, উন্নত জাতের ফলের চারা, আধুনিক ফল উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন সোহেলের সভাপতিত্বে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের আহম্মেদ।প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও শেখ জাবের আহম্মেদ বলেন:“ফল চাষের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের ঘাটতি পূরণে আমাদের দেশীয় ফলের ভূমিকা অপরিসীম।”তিনি মেলায় আগত সকলকে এবং উপজেলার সর্বস্তরের জনগণকে যার যার বসতবাড়ি ও পতিত জমিতে বিভিন্ন জাতের পুষ্টিকর ও লাভজনক ফলদ গাছ রোপণের উদাত্ত আহ্বান জানান।ছবি: সংগৃহীতঅনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নকিবুল হাসান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আঞ্জুমান আরা গোলেনুর, উপজেলা জামায়াতের আমির আবু বক্কর সিদ্দিক এবং পলাশবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত চন্দ্র প্রামানিক।এছাড়াও মেলা প্রাঙ্গণে কৃষি অফিসের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপজেলার দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৃষক-কৃষাণী, স্কুলের শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।মেলা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত সফল কৃষকরা তাদের নিজেদের বাগানে উৎপাদিত নানা প্রজাতির ও হরেক রকমের মৌসুমি ফল স্টলে প্রদর্শন করছেন।উপজেলা কৃষি অফিস তথা আয়োজকরা জানান, ফল চাষে স্থানীয় কৃষকদের আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করা, সাধারণ মানুষের মাঝে পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে ফল সংরক্ষণ ও সঠিক বাজারজাতকরণ বিষয়ে সম্যক ধারণা দেওয়াই এই মেলার মূল উদ্দেশ্য। আগামী তিন দিন এই মেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশীয় ফলের যত বিলুপ্ত প্রজাতি রয়েছে, সেগুলো কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) খামারবাড়ির বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট (কেআইবি) চত্বরে তিন দিনব্যাপী (১৮-২০ জুন) জাতীয় ফল মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।এর আগে তিনি পুরো মেলা ঘুরে দেশীয় বিভিন্ন ফলের সঙ্গে পরিচিত হন এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।কৃষিমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর দেশে ফল মেলার উৎসব হয়। এ মেলার মাধ্যমে ফল উৎপাদনে বিপ্লব ঘটেছে। দেশীয় ফলের যত বিলুপ্ত প্রজাতি রয়েছে, সেগুলো ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।কৃষিমন্ত্রী বলেন, একই সঙ্গে বিদেশ থেকে যেসব ফল আমদানি করা হতো, সেসব ফলের জাতের জিন এনে দেশে চাষাবাদের মাধ্যমে অনন্য বিপ্লব ঘটানো হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে আমাদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা হচ্ছে।ড্রাগন ফলের উদাহরণ দিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিদেশের তুলনায় আমাদের উৎপাদিত ড্রাগন ফল সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এ ফলের উদ্ভাবনী কাজে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।চলতি অর্থবছরে কৃষিতে বাজেট বেড়েছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, গত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। এর বাইরে উন্নয়ন ও প্রণোদনা বাজেট বেড়েছে গত অর্থবছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ। তাই কৃষিতে বাজেট কমেছে কথাটি সঠিক নয় বলে জানান মন্ত্রী।
রংপুরের জনপ্রিয় ও সুস্বাদু হাঁড়িভাঙা আমের আনুষ্ঠানিক বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে। তীব্র তাপদাহের কারণে এবার নির্ধারিত সময়ের পাঁচ দিন আগেই আম বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জে আনুষ্ঠানিকভাবে হাঁড়িভাঙা আমের বাজারজাতকরণের উদ্বোধন করেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন। এ সময় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।একসময় রংপুর অঞ্চলে আম বিক্রির প্রচলিত হিসাব ছিল ‘গন্ডা’ ও ‘হালি’ ভিত্তিক। দুই দশক আগেও ৩৬ গন্ডা বা ৩৬ হালিতে একশ আম পাইকারি বিক্রি হতো। পরে সেই আম শহরে ৩২ গন্ডায় একশ হিসেবে বিক্রি করা হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই গন্ডা হিসেবে আম বিক্রির প্রচলন সম্পর্কে জানেন না। এখন আম বিক্রি হয় কেজি দরে।স্থানীয় প্রবীণরা জানান, একসময় ৮ হালিকে এক পোয়া, ১৬ হালিকে দুই পোয়া এবং ২৪ হালিকে তিন পোয়া বলা হতো। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসজুড়ে বিভিন্ন জাতের আমে বাজার ভরে থাকত। আধুনিকতার ছোঁয়া ও আমের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গন্ডা ও হালির হিসাব হারিয়ে গেছে।প্রবীণ আলী হোসেন মোল্লা বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও ৩৬ গন্ডায় একশ আম ২৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হতো। ফজলি, কেরোয়া, এছাহাক তেলি, ছাইবুদ্দিন, আশ্বিনী, সাদা নেংড়া, কালা নেংড়া, কলিকাতা নেংড়া, মিশ্রীভোগ, গোপালভোগ, আম্রপালি, সাদা রচি, চোচা ও আঁটিসহ বিভিন্ন জাতের আম গন্ডা হিসেবে কেনাবেচা হতো। বর্তমানে এসব জাতের আমের চাষ কমে গেছে এবং বাজার দখল করেছে হাঁড়িভাঙা আম। তিনি বলেন, হাঁড়িভাঙা আমের ওজন সাধারণত ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম হয়ে থাকে। মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়ায় দেশজুড়ে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে অতীতের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিছু আম এখনো গন্ডা বা হালি হিসেবে বিক্রির ব্যবস্থা থাকা উচিত।কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলায় এবার প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হয়েছে এক হাজার ৯২০ হেক্টরের বেশি জমিতে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যায়। এবার হাঁড়িভাঙা আমের উৎপাদন ২০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যার বাজারমূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি।মৌসুমের শুরুতে হাঁড়িভাঙা আম প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও মৌসুমের শেষ দিকে দাম ১৫০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর এলাকার আমচাষি সামছুজ্জামান বলেন, এবার আমের ফলন খুবই ভালো হয়েছে। কৃষকরা ভালো দাম পাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবার হাঁড়িভাঙা আমের ‘অন ইয়ার’। ফলে উৎপাদনও বেশি হয়েছে। বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় কৃষকরা লাভবান হবেন বলে আশা করছি।
রংপুরের ঐতিহ্য আর গৌরবের প্রতীক, জিআই পণ্য ‘হাঁড়িভাঙা’ আমের আনুষ্ঠানিক বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকায় বাগানে আম পেড়ে এই মৌসুমের বিক্রয় কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন।উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে পদাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আমচাষি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন জেলা প্রশাসক। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি হাঁড়িভাঙা আমকে জেলা প্রশাসনের ‘অগ্রাধিকার প্রকল্প’ হিসেবে ঘোষণা করেন। চাষিরা এসময় আম সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ, যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, ব্যাংকিং সুবিধা বৃদ্ধি, হাটে স্থায়ী শেড ও ওয়াশ ব্লক স্থাপন এবং বিদেশে আম রফতানির সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানান।চাষিদের দাবির প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিয়ে বলেন, “হাঁড়িভাঙা আমের বিশ্ববাজার ধরতে এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্রুত সড়ক সংস্কার, ব্যাংকের শাখা স্থাপন এবং আম পরিবহনের জন্য ‘ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন’ চালুসহ সব সমস্যার সমাধানে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।”উদ্বোধনের প্রথম দিনেই পদাগঞ্জ হাটে প্রচুর আমের সরবরাহ দেখা গেছে। তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টির কারণে কেনাবেচায় কিছুটা ধীরগতি থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে বাজার। বর্তমানে প্রতি মণ হাঁড়িভাঙা আম মানভেদে ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।ফলন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াচলতি মৌসুমে শিলাবৃষ্টির কারণে আমের ফলন প্রায় ৩০ শতাংশ কম হলেও আমের আকার বেশ বড় হয়েছে। কৃষকরা জানান, ফলন কম হওয়ায় দাম আশানুরূপ না পেলে তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তবে কৃষি বিভাগ আশার বাণী শুনিয়েছে। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সিরাজুল ইসলাম জানান, ফলন কিছুটা কম হলেও আমের গুণগত মান ও আকার ভালো হয়েছে। শুরুতে দাম কিছুটা কম মনে হলেও দিন বাড়ার সাথে সাথে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।ঐতিহ্যবাহী এই আমের বাজারজাতকরণ শুরু হওয়ায় রংপুরের আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন ব্যস্ততা আর উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
ক্রমাগত লোকসানের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন দেশের কৃষকরা। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলেও ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।পীরগঞ্জের কৃষক শাফি মন্ডল জানান, এক বিঘা জমিতে মরিচ চাষের জন্য তিনি ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। আশা ছিল মরিচ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবেন এবং সংসারের খরচ মেটাবেন। কিন্তু বাজারে মরিচের দাম কম থাকায় বিক্রি করে উৎপাদন খরচের অর্ধেক টাকাও তুলতে পারেননি।তিনি আরও জানান, মরিচ চাষে লোকসানের পর বেঁচে থাকার তাগিদে অন্য জমিতে ধান চাষ করেন। ধান কাটার পর ঋণ পরিশোধের জন্য বাধ্য হয়ে মৌসুমেই মাত্র ৭৫০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে, চাষ করা মরিচ বর্তমানে মাত্র ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কৃষকটির ভাষ্য, “আমরা আর বাঁচবো না। কৃষক মরে শেষ হয়ে যাব। আমাদের দেখার কেউ নেই।”কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না হলে কৃষি খাত আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের মতে, লোকসান ও ঋণের চাপ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অনেকেই কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারেন।
দেশের ঐতিহ্যবাহি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম আগামী ২০ জুন থেকে বাজারে আসা শুরু হবে। দেশে উৎপাদিত একমাত্র আঁশবিহিন সুস্বাদু এই ফল দেশে উৎপাদিত সব আমের সেরা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এবারেও আম পুষ্ট হবার আগেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে ২৫ কোটি টাকারও বেশি আমের রপ্তানি অর্ডার পেয়েছেন বাগান মালিকরা।তবে এবার বৈশাখ মাস জুড়ে অবিরাম বৃষ্টি আর ঝড়ের কারণে ফলন কম হবার আশঙ্কা করছেন আমচাষিরা। তারা বলছেন, এবারের বৈরী আবহাওয়া, বৃষ্টি, ঝড়সহ নানা প্রতিকূলতার কারণে ফলন ভালো হচ্ছে না।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর রংপুরে ২ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে।যা গত বছরের চেয়ে ২শ হেক্টর বেশি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পরেও ৩০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের আশা করছেন বাগান মালিক ও চাষিরা। যাতে অন্তত ২শ কোটি টাকার আম তারা বিক্রি করতে পারবেন।এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, হাঁড়িভাঙ্গা আম পুরোপুরি পুষ্ট হতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আমের চেয়ে বেশি সময় লাগে।ফলে আগামী ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এবারে হাঁড়িভাঙ্গা আমের আকার অন্যান্য বারের চেয়ে কাঙ্ক্ষিত হয়েছে।ন্যায্য মূল্য পেলে আমচাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা করছেন। তাছাড়া অন্যান্য বারের চেয়ে এবারে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাহিদা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেশি হবে বলে আশা করছেন আম ব্যবসায়ীরা।হাঁড়িভাঙ্গার ইতিহাসরংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লালমাটি বলে পরিচিত পদাগঞ্জ এলাকায় হাঁড়িভাঙ্গা আম প্রথম উৎপাদন করেন সালাম নামের এক চাষি।সম্পূর্ণ আঁশমুক্ত আর দারুণ সুস্বাদু হওয়ায় আমটির চাহিদা এখন উত্তরাঞ্চল আর দেশ ছাপিয়ে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে।প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার আম রপ্তানি করছেন চাষিরা।ফলে বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর, পদাগঞ্জ, কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট সর্দ্দারপাড়া, সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করণী ইউনিয়নের কাঁটাবাড়ি, পাশের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই এখন গড়ে উঠেছে হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাণিজ্যিক বাগান।মূলত, লালমাটি এলাকায় হাঁড়িভাঙ্গা আমের যেমন ভালো ফলন হয়, তেমনি অনেক বেশি সুস্বাদুও। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবার নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠেছে।আমচাষিরা বলছেন, বৈশাখ মাস জুড়ে অবিরাম ঝড়-বৃষ্টির কারণে আমের অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে।ক্ষুদ্র চাষিদের অভিযোগ, আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে তারা আরও বেশি লাভবান হতে পারতেন।আমচাষিদের অভিযোগ, বড় বড় ব্যবসায়ী আগাম টাকা দিয়ে আমের বাগান কিনে নেয়ায় তারা লাভবান হচ্ছেন বেশি।এভাবেই হাঁড়িভাঙ্গা আম বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার অন্তত ৯০টি গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে। এই আম চাষ করে হাজার হাজার পরিবার এখন একেবারেই স্বাবলম্বি।সরেজমিনে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার পদাগঞ্জ ও খোড়াগাছ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি বাগান ছাড়াও প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে ১০-১৫টি হাঁড়িভাঙ্গা আমের গাছ। আবার কোনো কোনো বাড়ি ঘিরে শুধুই আমগাছ। আম পাকা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। একই এলাকার আমচাষি মনোয়ার হোসেন, রহমত আলী, আয়েশা বেগমসহ অনেকেই জানালেন, ১০ বছর আগেও এসব এলাকা ছিলো অভাবী মানুষে ভরা। এখন সেই অভাব দূর হয়েছে। সচ্ছলতা এসেছে ঘরে ঘরে।এক সময় তিন বেলা তো দূরের কথা এক বেলা খাবারও জুটতো না।মাটি লাল হওয়ায় বছরে একবার মাত্র ধান উৎপাদন হতো। বাকি ৮ মাস পতিত পড়ে থাকতো। তবে হাঁড়িভাঙ্গা আম এসে তাদের ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছে। এখন এক ফসলি ধানী জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক আম বাগান।বছরে আম বিক্রি করে সবার সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, ভূমিহীন পরিবারগুলো তাদের বাস্তুভিটাতেই হাঁড়িভাঙ্গা আম গাছ লাগিয়ে উৎপাদিত আম বিক্রি করে সচ্ছলতা এনেছেন।তবে চাষিদের সবার দাবি একটাই, আম সংরক্ষণে ব্যবস্থা করা। কারণ সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় পানির দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হন।এ ব্যাপারে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ দাবি করছেন চাষিরা।হাঁড়িভাঙ্গা আমের সবচেয়ে বড় বাগান মালিক রমজান আলী জানান, ঢাকা থেকে বেশ কয়েকজন আড়তদার এবার অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং করছেন। তার মতো আরও অন্তত ৪০টি বাগান মালিকদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আপাতত ২০ কোটি টাকার আমের অর্ডার মিলেছে। তবে রপ্তানি এবার ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা চাষিদের।একই কথা বললেন আমচাষি রবিউল ইসলাম।রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন জানান, সরাসরি বাগান থেকে যাতে আম কিনতে পারা যায়, সেজন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। টাকা লেনদেনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ খোলা হবে। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর নজরদারিও বাড়ানো হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম পৌঁছে দেওয়ার জন্য জনপ্রিয় কুরিয়ার সার্ভিসগুলো পদাগঞ্জ এলাকায় বিশেষ অফিস স্থাপন করেছে।তারা বাগান থেকে আম সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা রেখেছে।জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, কৃষিবিভাগসহ সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে আগামী ২০ জুন থেকে হাঁড়িভাঙ্গা আম বিক্রি করার সময় নির্ধারণ করে দিয়েছি।রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, এবার অবিরাম ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও তা অস্বাভাবিক নয়। এতে ততবেশি ক্ষতি হবে না বলেও মনে করছেন হাবিবুর রহমান।রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিপণন বিভাগের উপ-পরিচালক সিফাত জাহান জানান, হাঁড়িভাঙ্গা আম রংপুরের ঐতিহ্যকে আরো বেশি করে দেশে বিদেশে পরিচিত করেছে। এবার আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে ফলন একটু কম হলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। আশা করা যায়, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩০ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবার চাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা করা যায়।