রংপুর    শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
জুফাস নিউজ

আপনার সন্তান কত নিরাপদ? তারাগঞ্জে মাদকের জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র, নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের চিরুনি অভিযান

আজকে ঘরের বাইরে গেলে আমার সন্তান কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়। যেভাবে পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটছে, তাতে যেকোনো সময় যে কেউ বিপথগামী হতে পারে”— ক্ষোভ ও গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার এক স্থানীয় অভিভাবক। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উপজেলায় মাদকের ভয়াবহতা ও এর বিস্তার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উপজেলার তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশ বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সস্তা ও সহজে বহনযোগ্য মারাত্মক ব্যথানাশক নিষিদ্ধ 'ট্যাপেন্টাডল' ট্যাবলেট এখন চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।তবে মাদকের এই করাল গ্রাস থেকে সমাজকে মুক্ত করতে এবং অভিভাবকদের মনে স্বস্তি ফেরাতে তারাগঞ্জ থানা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কঠোর চিরুনি অভিযান অব্যাহত রেখেছে।তারাগঞ্জ থানা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, রংপুরের নিয়মিত অভিযানে গত কয়েক সপ্তাহে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও বেশ কিছু বড় ধরনের গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে:১০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ও ২৫ পিস ইয়াবা: মাদক কারবারি মো. মোকছেদুল ইসলাম (৫২)-কে তাঁর নিজ বাড়ির সামনে থেকে বিপুল পরিমাণ এই মাদকসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।৮০ পিস ট্যাপেন্টাডল ও ২২ পুরিয়া হেরোইন: মফেল (৩০) ও বেলাল (২৮) নামের দুই মাদক ব্যবসায়ীকে এই মারাত্মক মাদক চালানের সময় গ্রেপ্তার করা হয়।৭৬ বছরের বৃদ্ধের ঘরে গাঁজার মজুদ: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, রংপুরের বিশেষ অভিযানে ইকরচালী কামারপাড়া গ্রামের নৃপেন চন্দ্র রায় (৭৬)-এর বসতঘর থেকে ৩০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী তারাগঞ্জ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।ট্যাপেন্টাডলসহ আরও যারা গ্রেপ্তার: তারাগঞ্জ ব্র্যাক মোড় এলাকা থেকে ঘনিরামপুর দৌলতপুর গ্রামের মো. সিরাজুল ইসলাম (৩৫)-কে ১৩ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে রিপন বাসফোর (২২) ২৫ পিস, মিলন বাঁশফোড় ২০ পিস, মো. হাফিজুল ইসলাম (২৫) ১০ পিস, মো. জাহানুর ইসলাম (২৫) ৭১ পিস এবং ওরফে সাদ্দাম (৩৭) নামের এক ব্যক্তিকে ৮ পিস নিষিদ্ধ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।মাদক সেবন ও বিক্রির অপরাধ হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ও এক্সিকিউ ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে পরিচালিত পৃথক পৃথক ভ্রাম্যমাণ আদালতে বেশ কয়েকজনকে তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়া হয়েছে:মাদক ব্যবসায়ী জাকিরের ১ বছর জেল: মাদক ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন (৪৩) নামের এক ব্যক্তিকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।রাসেল প্রামাণিকের ১৫ দিন জেল: কুর্শা ইউনিয়নে ট্যাপেন্টাডল সেবনের দায়ে মো. রাসেল প্রামাণিক (২৮)-কে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোনাব্বর হোসেন।মিলন ইসলামের ৭ দিনের জেল: ব্র্যাক মোড় এলাকায় মাদক সেবনের অপরাধে মো. মিলন ইসলাম (৩২)-কে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউティブ ম্যাজিস্ট্রেট আসমা উল হুসনা।লিয়ন ও লালবাবু শীলের কারাদণ্ড: অপরাধ স্বীকার করায় লিয়ন (৩২) নামের এক যুবককে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ টাকা অর্থদণ্ড এবং শ্রী লালবাবু শীলকে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও নগদ ১০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।স্থানীয় সচেতন মহল ও সমাজকর্মীদের মতে, মাদকের এই সহজলভ্যতা কেবল তরুণদের স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে না, বরং এর ফলে এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি সন্তানদের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।তারাগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এবং থানা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অভিভাবকদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, মাদক কারবারিদের কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হবে না। সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ তারাগঞ্জ গড়ে তুলতে এবং উপজেলাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করতে এই বিশেষ চিরুনি অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আগামী দিনগুলোতে আরও জোরদার ও কঠোর করা হবে।

আপনার সন্তান কত নিরাপদ? তারাগঞ্জে মাদকের জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র, নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের চিরুনি অভিযান