গাছে গাছে ঝুলছে মুগ্ধের সচেতনতার বাণী
ফুলবাড়ির পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুগ্ধের ব্যাতিক্রমধর্মী সমাজ সচেতনতা মুলক কাজে মুগ্ধ এলাকার সবাই। মুগ্ধ নিজের হাতের লেখা বিভিন্ন সচেতনতামূলক বাণী লিখে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের দুপাশের গাছে গাছে ঝুলিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে।কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর বড়ভিটা ইউনিয়নের শাহবাজারের ঘোগারকুটি গ্রামের পাকা সড়কের দুপাশে সারিবদ্ধ গাছ। সেই গাছের ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে সুন্দর হাতের লেখায় কয়েকটি পোস্টার। এসব পোস্টারে লেখা, অকারণে গাছ কাটবো না, পাখি আমাদের বন্ধু, মোড়ে গতি কমান জীবন বাঁচান বা মাদককে না বলুন, বাল্য বিয়েকে না বলুন, ট্রাফিক আইন মেনে চলুন।’সড়কে এই পথ ধরে যারাই হেঁটে যাচ্ছেন, তারাই থমকে দাঁড়াচ্ছেন, পোস্টারের লেখাগুলো পড়ছেন আর বিষ্মিত হচ্ছেন। এই পোস্টারগুলো লিখেছে ওই গ্রামেরই উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী মিছবাহুল ইসলাম মুগ্ধ।মুগ্ধ বরাবর ক্লাসে ১ম হয়। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে চিন্তা করে এলাকার জন্য, দেশের জন্য ভাল কিছু করার। এজন্য সময় পেলেই সে রঙ-তুলি আর কাগজ নিয়ে পরম যত্নে মেঝেতে বসে বিভিন্ন বাণী লেখে। স্কুলে টিউটোরিয়াল ক্লাস থেকে ছবি আঁকা ও সুন্দর হাতের লেখার হাতেখড়ি তার। আর সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সে এখন একাই বদলে দিচ্ছে চারপাশের চিরচেনা রূপ। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছে ক্লাসের সহপাঠী ও এলাকার শিশুরা।মুগ্ধ নিজের সাইকেলে বা হেঁটে হেঁটে বন্ধুদেরকে নিয়ে সুতো দিয়ে গাছের গায়ে পোস্টার লাগায়। এজন্য সে একটি মইও তৈরি করেছে।পথচারী রিয়াজুল ইসলাম জানান, ‘আমরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় লেখাগুলো দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি। এতো ছোট্ট একটা ছেলে এতো সুন্দর চিন্তা করতে পারে, তা ভাবাই যায় না।’মুগ্ধর মা মমতা বেগম জানান, ‘আমার ছেলে ঘরে থাকা বিভিন্ন কার্টন কেটে খাতার পৃষ্ঠা ছিড়ে বিভিন্ন বাণী লিখে জমা করতো। এরপর পাড়ার বন্ধুরা মিলে একটা মই তৈরি করে আমার কাছ থেকে আটা আর সুতো কিনে সেগুলো নিয়ে বাইরে যায়। পরে পাড়ার লোকজন এসে বলতে লাগলো তোমার ছেলে পুরো গ্রামজুড়ে গাছের মধ্যে পোস্টার লাগিয়ে বেড়াচ্ছে। কথাগুলো শুনে আমরা বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে। ছেলে যে এ ধরণের পরিকল্পনা করেছে আমার জানা ছিল না। ওর জন্য সবাই দোয়া করবেন। সমাজের জন্য মানুষের জন্য যেন সবসময় ভালো কিছু করে।’মুগ্ধর বাবা ফুলবাড়ি শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক সুজাউদ্দৌলা জানান, ‘স্কুল ছুটি শেষে বাসায় ফিরছিলাম সবাই বলাবলি করছে মুগ্ধ গাছে গাছে যেন কি লাগাচ্ছে। আমি সড়কের দুপাশে তাকিয়ে লক্ষ্য করি আমার ছেলের হাতের লেখা পোস্টার! সুন্দর সুন্দর নীতিবাক্য লিখে ছড়িয়ে দিয়েছে। গোপনে এসব কাজ করছিল সে। আমাকে জানায়নি। আমি সত্যি অবাক হয়ে গেছি। এতো ইমোশনাল হয়ে গেছি যে, বাসায় এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। আপনারা দোয়া করবেন ছেলে যতদিন এ ধরণের কাজ করবে ততদিন আমি তাকে বন্ধুর মতো সহযোগিতা করবো।’[TECHTARANGA-POST:6826]উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী জানান, ‘টিউটেরিয়াল ক্লাসে ছবি আঁকা, পোস্টার-প্লাকার্ড ও হাতের লেখা শিখানো হতো। মুগ্ধর হাতের লেখা ভালো ছিল। সবসময় নতুন কিছু করতে চাইতো। সেই চাওয়া থেকে হয়তো এমন ভালো কাজ করতে পেরেছে সে। এভাবে সব শিক্ষার্থী যদি সামাজিক জনসচেতনামূলক কাজে এগিয়ে আসে তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।’দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট মুগ্ধ বলে, ‘আমি গ্রামের মানুষকে নিয়ে ভাবি। এলাকার অনেক মানুষ পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন নয়, তারা অকারণে গাছ কেটে ফেলছে, বাড়ির চারপাশ নোংরা করে ফেলছে, অনেকে মাদকে আসক্ত। এসব মানুষকে সচেতন করার জন্য পোস্টার লিখে বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তার দুপাশে লাগিয়ে দেই। যাতে তারা মনে করে অনেক কাজ আছে যেগুলো তারা না করলেও পারে। আমার এই ছোট্ট কাজে যদি একজন মানুষও সচেতন হয় সেটাই হবে আমার সফলতা। এই কাজ আমি চালিয়ে যাবো।’ফুলবাড়ী উপজেলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বড়ভিটা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও সংস্কৃতিকল্যাণ ট্রাস্ট’র পরিচালক মো. নুর মোহাম্মদ বলেন, সমাজে সৃজনশীল ও সচেতনতামূলক কাজে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের খুব একটা দেখা যায় না। এই ধরনের প্রতিভাবান ও দেশপ্রেমিক শিশুরাই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের মুগ্ধর মতো শিশুদের পাশে থাকা দরকার। তাদের চিন্তা শক্তিকে বলিয়ান করতে সহযোগিতা করা দরকার।