রংপুর    সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
জুফাস নিউজ

‘অটোরিকশার’ চার্জেই যাচ্ছে দেশের ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ!

ভোর রাতে যখন তীব্র লোডশেডিং আর গরমে গ্রামের পর গ্রাম মানুষ হাঁসফাঁস করে, কিংবা দিনের বেলায় বিদ্যুৎ সংকটে কলকারখানার চাকা বন্ধ হতে বসে—ঠিক তখন মধ্যরাতে দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে ঘটে এক বিস্ময়কর ঘটনা। ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ছোঁয়া মাত্রই হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ে বিদ্যুতের চাহিদা। মধ্যরাতে যেখানে স্বাভাবিক নিয়মেই চাহিদা ১ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট কমার কথা, সেখানে গ্রিডের ওপর তৈরি হয় এক বিশাল ‘অদৃশ্য’ চাপ।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জাতীয় গ্রিডের এই রক্তক্ষরণের নেপথ্যে রয়েছে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। প্রতিদিন দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ একাই গ্রাস করছে এই অনিয়ন্ত্রিত বাহনগুলো, যার বড় অংশই চুরি হচ্ছে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাবে অটোরিকশার সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ লাখ বলা হলেও বেসরকারি সংস্থা সিপিডি ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে এটি প্রায় ৬০ লাখ, যার কেবল ঢাকাতেই রয়েছে ২০ লাখ।প্রতিটি অটোরিকশায় থাকা ৪ থেকে ৬টি ব্যাটারি রিচার্জ করতে প্রতিদিন লাগে প্রায় ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ। গবেষণা বলছে, শুধু অটোরিকশা চার্জ দিতেই প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর বিদ্যুতের খুঁটি থেকে মূল মিটার বাইপাস করে টানা অবৈধ লাইনের কারণে সরকার প্রতি বছর হারায় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিপুল রাজস্ব।বিদ্যুৎ চুরির পাশাপাশি এই খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ক্ষমতার বলয় ও অবৈধ লেনদেনের পথ।রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে শুরু করে অলিতে-গলিতে থাকা অবৈধ গ্যারেজগুলোতে প্রতিটি রিকশা থেকে দৈনিক গড়ে ১০০ টাকা করে আদায় করা হয়। কেবল ঢাকাতেই প্রতিদিন লেনদেন হয় ২০ কোটি টাকা, যা বছরে দাঁড়ায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকায়। আর দেশজুড়ে গ্যারেজ কেন্দ্রিক এই চাঁদা ও ভাড়ার অবৈধ বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা!বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন:"রিকশাগুলো অবৈধ হলেও চালকরা ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিয়ে ঠিকই রাস্তায় চলছেন। এর পেছনে বিশাল এক অর্থনীতি জড়িয়ে আছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারকে কঠোর হতে হবে।"পোশাক কারখানা বা অন্যান্য পেশা থেকে ছাঁটাই হওয়া মানুষ কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই মাত্র ৭০-৭২ হাজার টাকার অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমে জীবনসংগ্রাম চালাচ্ছেন। প্রায় ৬০ লাখ পরিবারের জীবিকা এখন এই তিন চাকার ওপর নির্ভরশীল।তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়া রাস্তায় নামা এসব চালকদের অদক্ষতায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, কেবল এক বছরেই অটোরিকশা সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় ১,৩৭৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতারাতি রিকশা বন্ধ করে লাখ লাখ মানুষকে বেকার করা সম্ভব নয়। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বিদ্যুৎ চুরির মূলে থাকা অবৈধ লাইনম্যান, গ্যারেজ মালিক ও সিন্ডিকেটের ওপর সরাসরি কঠোর অভিযান চালাতে হবে। রিকশা নিষিদ্ধ না করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনাই এখন একমাত্র সমাধান।

 ‘অটোরিকশার’ চার্জেই যাচ্ছে দেশের ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ!