‘জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।’
সাত বছর আগে নিজের জন্মদিনে কথাগুলো বলেছিলেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নির্মাতা ও পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার।
আজ সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন।
আজ সকালে মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা। কেউ মনে করেছেন ‘নতুন কুঁড়ি’র নির্মাতাকে, কেউ ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’–কে, কেউবা শিশুদের প্রিয় ‘মীনা’ চরিত্রের পেছনের মানুষটিকে।
অনেকে আবার তাঁর আঁকা ছবি, টেলিভিশনে নির্মিত নাটক ও অনুষ্ঠান কিংবা বাংলা সংস্কৃতির জন্য তাঁর নিরলস কাজের কথা স্মরণ করেছেন। এত সব পরিচয়ের ভিড়েও মুস্তাফা মনোয়ার নিজেকে দেখতেন একেবারে অন্যভাবে। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, তিনি সারা জীবন শিশুমনের মানুষ হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। বয়স তাঁর কাছে ছিল শুধু সংখ্যার হিসাব—বিস্ময়, কৌতূহল আর পৃথিবীকে ভালোবাসার ক্ষমতাই ছিল মানুষের প্রকৃত বয়স।
২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মদিনে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান ‘তারকা কথন’-এ অতিথি হয়ে মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, ‘বয়সটা দুই রকম। একটা অঙ্কের ব্যাপার, আরেকটা মনের তৃপ্তির ব্যাপার। পৃথিবীকে দেখার ব্যাপার, পৃথিবীকে ভালোবাসার ব্যাপার। সেইখানে বয়স বাড়ে না।’
জন্মদিন নিয়ে মুস্তাফা মনোয়ারের উপলব্ধিও ছিল একেবারেই নিজস্ব। তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।’
এই কথাগুলো যেন মুস্তাফা মনোয়ারের পুরো জীবনদর্শনের সারসংক্ষেপ। বয়স বাড়লেও বিস্ময় হারাতে চাননি তিনি। শিল্প, প্রকৃতি, শিশু আর মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার শক্তি।
সেই অনুষ্ঠানেই তরুণদের নিয়ে আশাবাদী কণ্ঠে মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, ‘আমরা দিনের আলোতে যা কিছু দেখি, তার চেয়েও বেশি দেখতে পাই রাতের অন্ধকারে। আমাদের তরুণদের জীবনে অনেক স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্নই দেশকে বাঁচিয়ে রাখবে, উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।’
চিত্রশিল্পী হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ারের খ্যাতি ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরেও। আর্ট কলেজে পড়ার সময় জলরঙে তাঁর কাজের প্রশংসা করেছিলেন কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। তাঁর মন্তব্য ছিল, মুস্তাফা মনোয়ারের ছবি খুব অল্প রেখায় অনেক কথা বলতে পারে। অথচ নিজের কাজ নিয়ে তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। জীবনের শেষ দিকেও জলরঙের একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করছিলেন।
অনেকেই জানেন না, গানও ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের আরেক ভালোবাসা। কলকাতায় ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে তালিম নিয়েছিলেন। শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে তিন বছর গান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত গান ছেড়ে দেন। কয়েক বছর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘অনেক চর্চা করতে হয়। তা ছাড়া বাঁধাধরা জিনিস ভালো লাগে না। গানে তাল আছে। বড় ওস্তাদেরা টান দিয়ে তালে ফিরতে পারেন। আমি পারতাম না।’
বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান মুস্তাফা মনোয়ারের। হুগলি, বাঁকুড়া ও কলকাতায় পাপেট দেখে তাঁর আগ্রহ জন্মেছিল। পরে তাঁর সৃষ্টি ‘পারুল’ চরিত্র দেখে ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি অনুপ্রাণিত হন। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই জন্ম নেয় দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর পরিচিত চরিত্র ‘মীনা’।
ভাষা আন্দোলনের সময়ও মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন প্রতিবাদী। ১৯৫২ সালে স্কুলে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলন নিয়ে কার্টুন এঁকে এক মাস কারাবন্দী হয়েছিলেন। পরে চারুকলার শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন। কারণ, বাংলা সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তিনি দেখেছিলেন টেলিভিশনে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানও অনন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’, মুনীর চৌধুরীর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’—সবখানেই ছিল তাঁর সৃজনশীলতার ছাপ।
সব ছেড়ে মুস্তাফা মনোয়ার আজ সকালে চিরবিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর বলা একটি কথাই যেন তাঁর জীবনকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে—‘পৃথিবীকে ভালোবাসার বয়স বাড়ে না।’ সম্ভবত এ কারণেই মুস্তাফা মনোয়ার কখনো সত্যিকার অর্থে বৃদ্ধ হননি। বয়সের হিসাবে তিনি ৯০; কিন্তু শিল্পের ভুবনে তিনি চিরকালই রয়ে গেলেন এক কৌতূহলী, স্বপ্নবাজ, শিশুমনের মানুষ।

সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬
‘জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।’
সাত বছর আগে নিজের জন্মদিনে কথাগুলো বলেছিলেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নির্মাতা ও পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার।
আজ সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন।
আজ সকালে মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা। কেউ মনে করেছেন ‘নতুন কুঁড়ি’র নির্মাতাকে, কেউ ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’–কে, কেউবা শিশুদের প্রিয় ‘মীনা’ চরিত্রের পেছনের মানুষটিকে।
অনেকে আবার তাঁর আঁকা ছবি, টেলিভিশনে নির্মিত নাটক ও অনুষ্ঠান কিংবা বাংলা সংস্কৃতির জন্য তাঁর নিরলস কাজের কথা স্মরণ করেছেন। এত সব পরিচয়ের ভিড়েও মুস্তাফা মনোয়ার নিজেকে দেখতেন একেবারে অন্যভাবে। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, তিনি সারা জীবন শিশুমনের মানুষ হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। বয়স তাঁর কাছে ছিল শুধু সংখ্যার হিসাব—বিস্ময়, কৌতূহল আর পৃথিবীকে ভালোবাসার ক্ষমতাই ছিল মানুষের প্রকৃত বয়স।
২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মদিনে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান ‘তারকা কথন’-এ অতিথি হয়ে মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, ‘বয়সটা দুই রকম। একটা অঙ্কের ব্যাপার, আরেকটা মনের তৃপ্তির ব্যাপার। পৃথিবীকে দেখার ব্যাপার, পৃথিবীকে ভালোবাসার ব্যাপার। সেইখানে বয়স বাড়ে না।’
জন্মদিন নিয়ে মুস্তাফা মনোয়ারের উপলব্ধিও ছিল একেবারেই নিজস্ব। তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।’
এই কথাগুলো যেন মুস্তাফা মনোয়ারের পুরো জীবনদর্শনের সারসংক্ষেপ। বয়স বাড়লেও বিস্ময় হারাতে চাননি তিনি। শিল্প, প্রকৃতি, শিশু আর মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার শক্তি।
সেই অনুষ্ঠানেই তরুণদের নিয়ে আশাবাদী কণ্ঠে মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, ‘আমরা দিনের আলোতে যা কিছু দেখি, তার চেয়েও বেশি দেখতে পাই রাতের অন্ধকারে। আমাদের তরুণদের জীবনে অনেক স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্নই দেশকে বাঁচিয়ে রাখবে, উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।’
চিত্রশিল্পী হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ারের খ্যাতি ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরেও। আর্ট কলেজে পড়ার সময় জলরঙে তাঁর কাজের প্রশংসা করেছিলেন কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। তাঁর মন্তব্য ছিল, মুস্তাফা মনোয়ারের ছবি খুব অল্প রেখায় অনেক কথা বলতে পারে। অথচ নিজের কাজ নিয়ে তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। জীবনের শেষ দিকেও জলরঙের একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করছিলেন।
অনেকেই জানেন না, গানও ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের আরেক ভালোবাসা। কলকাতায় ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে তালিম নিয়েছিলেন। শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে তিন বছর গান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত গান ছেড়ে দেন। কয়েক বছর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘অনেক চর্চা করতে হয়। তা ছাড়া বাঁধাধরা জিনিস ভালো লাগে না। গানে তাল আছে। বড় ওস্তাদেরা টান দিয়ে তালে ফিরতে পারেন। আমি পারতাম না।’
বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান মুস্তাফা মনোয়ারের। হুগলি, বাঁকুড়া ও কলকাতায় পাপেট দেখে তাঁর আগ্রহ জন্মেছিল। পরে তাঁর সৃষ্টি ‘পারুল’ চরিত্র দেখে ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি অনুপ্রাণিত হন। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই জন্ম নেয় দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর পরিচিত চরিত্র ‘মীনা’।
ভাষা আন্দোলনের সময়ও মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন প্রতিবাদী। ১৯৫২ সালে স্কুলে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলন নিয়ে কার্টুন এঁকে এক মাস কারাবন্দী হয়েছিলেন। পরে চারুকলার শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন। কারণ, বাংলা সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তিনি দেখেছিলেন টেলিভিশনে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানও অনন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’, মুনীর চৌধুরীর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’—সবখানেই ছিল তাঁর সৃজনশীলতার ছাপ।
সব ছেড়ে মুস্তাফা মনোয়ার আজ সকালে চিরবিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর বলা একটি কথাই যেন তাঁর জীবনকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে—‘পৃথিবীকে ভালোবাসার বয়স বাড়ে না।’ সম্ভবত এ কারণেই মুস্তাফা মনোয়ার কখনো সত্যিকার অর্থে বৃদ্ধ হননি। বয়সের হিসাবে তিনি ৯০; কিন্তু শিল্পের ভুবনে তিনি চিরকালই রয়ে গেলেন এক কৌতূহলী, স্বপ্নবাজ, শিশুমনের মানুষ।

আপনার মতামত লিখুন