রংপুর    শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
জুফাস নিউজ
আপডেট : শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

শৈশবে একসাথে খেলাধুলা, শেষযাত্রাতেও পাশাপাশি দুই বন্ধু অহিদ ও মাসুদ

শৈশবে একসাথে খেলাধুলা, শেষযাত্রাতেও পাশাপাশি দুই বন্ধু অহিদ ও মাসুদ
কাল যারা একসাথে ঈদ করল, আজ তারা চিরঘুমে পাশাপাশি । ছবি: জুফাস রি নিউজ

শৈশবে একই উঠানে খেলাধুলা, ধুলোমাখা পথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা আর একসাথে বেড়ে ওঠা—সবই ছিল তাদের অভিন্ন। নিয়তি যেন তাদের এই অটুট বন্ধুত্বে বিচ্ছেদ সইতে চাইল না। তাই তো জীবনের শেষ যাত্রাতেও তারা রইলেন একে অপরের পাশেই। ঈদের আনন্দ শেষ হতে না হতেই রংপুরের তারাগঞ্জে যমুনেশ্বরী নদীর শীতল জল কেড়ে নিল দুই কিশোর বন্ধু অহিদ ইসলাম (১৪) ও মাসুদ রানার (১৫) প্রাণ।

গতকাল শুক্রবার (২৯ মে) দুপুরে তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কাছিয়াবাড়ি এলাকায় যমুনেশ্বরী নদীতে গোসল করতে নেমে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত অহিদ ও মাসুদ দুজনই উপজেলার কিসামত মেনানগর ডাংগীর হাট তেলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে অল্প বয়সেই এই দুই কিশোর ঢাকায় গিয়ে নির্মাণশ্রমিকের (রাজমিস্ত্রি) কাজ শুরু করেন। মাসুদ সপরিবারে ঢাকায় থাকলেও ঈদ উপলক্ষে গ্রামে এসেছিলেন। আর ভ্যানচালক বাবার সংসারের হাল ধরতে এক বছর আগে ঢাকা যাওয়া অহিদও পরিবারের সাথে ঈদ কাটাতে বাড়ি ফিরেছিলেন দুদিন আগে। ঈদের দিনও তারা দুজনে একসাথে নতুন জামা পরে ঘুরে বেরিয়েছেন, ছবি তুলেছেন। কিন্তু কে জানত, এই ঈদ উদযাপনে বাড়ি ফেরাটাই তাদের শেষ ফেরা হবে!

শুক্রবার সকালে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির অদূরে যমুনেশ্বরী নদীতে গোসল করতে নামেন তারা। কিন্তু সাঁতার না জানায় একপর্যায়ে নদীর গভীর পানিতে তীব্র স্রোতের তোড়ে তলিয়ে যান দুজনেই। ঘটনাস্থলেই অহিদের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে স্থানীয়রা মাসুদকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। 

গতকাল বিকেলে তেলিপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক চরম হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে বাড়িতে ঈদের আনন্দ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই প্রিয়জন হারানোর বুকফাটা আহাজারি। দুই প্রিয় সন্তান ও বন্ধুকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পুরো জনপদ।

প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন,

“সবই আল্লাহর লিখন। ছোটবেলা থেকে ওরা একসাথে ছিল, আজ একসাথে চলেও গেল। কবরেও তারা পাশাপাশি রইল।”

তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমীন জানান, কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল মাগরিবের নামাজ শেষে স্থানীয় খিয়ারডাঙ্গা কবরস্থানে পাশাপাশি দুটি কবরে দুই বন্ধুকে দাফন করা হয়।

অভাবের সংসারে আলো ছড়াতে যারা শহর পাড়ি দিয়েছিল, ঈদের আনন্দ ভাগ করতে এসে তাদের এমন আকস্মিক বিদায় কেউ মেনে নিতে পারছেন না। চিরচেনা সেই ধুলোমাখা পথ আর যমুনেশ্বরীর পাড় আজীবন সাক্ষী হয়ে রইল দুই বন্ধুর এক অবিচ্ছেদ্য ও চিরন্তন বন্ধুত্বের গল্পের।

বিষয় : তারাগঞ্জ তারাগঞ্জ উপজেলার খবর

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
জুফাস নিউজ

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬


শৈশবে একসাথে খেলাধুলা, শেষযাত্রাতেও পাশাপাশি দুই বন্ধু অহিদ ও মাসুদ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬

featured Image

শৈশবে একই উঠানে খেলাধুলা, ধুলোমাখা পথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা আর একসাথে বেড়ে ওঠা—সবই ছিল তাদের অভিন্ন। নিয়তি যেন তাদের এই অটুট বন্ধুত্বে বিচ্ছেদ সইতে চাইল না। তাই তো জীবনের শেষ যাত্রাতেও তারা রইলেন একে অপরের পাশেই। ঈদের আনন্দ শেষ হতে না হতেই রংপুরের তারাগঞ্জে যমুনেশ্বরী নদীর শীতল জল কেড়ে নিল দুই কিশোর বন্ধু অহিদ ইসলাম (১৪) ও মাসুদ রানার (১৫) প্রাণ।

গতকাল শুক্রবার (২৯ মে) দুপুরে তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কাছিয়াবাড়ি এলাকায় যমুনেশ্বরী নদীতে গোসল করতে নেমে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত অহিদ ও মাসুদ দুজনই উপজেলার কিসামত মেনানগর ডাংগীর হাট তেলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে অল্প বয়সেই এই দুই কিশোর ঢাকায় গিয়ে নির্মাণশ্রমিকের (রাজমিস্ত্রি) কাজ শুরু করেন। মাসুদ সপরিবারে ঢাকায় থাকলেও ঈদ উপলক্ষে গ্রামে এসেছিলেন। আর ভ্যানচালক বাবার সংসারের হাল ধরতে এক বছর আগে ঢাকা যাওয়া অহিদও পরিবারের সাথে ঈদ কাটাতে বাড়ি ফিরেছিলেন দুদিন আগে। ঈদের দিনও তারা দুজনে একসাথে নতুন জামা পরে ঘুরে বেরিয়েছেন, ছবি তুলেছেন। কিন্তু কে জানত, এই ঈদ উদযাপনে বাড়ি ফেরাটাই তাদের শেষ ফেরা হবে!

শুক্রবার সকালে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির অদূরে যমুনেশ্বরী নদীতে গোসল করতে নামেন তারা। কিন্তু সাঁতার না জানায় একপর্যায়ে নদীর গভীর পানিতে তীব্র স্রোতের তোড়ে তলিয়ে যান দুজনেই। ঘটনাস্থলেই অহিদের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে স্থানীয়রা মাসুদকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। 

গতকাল বিকেলে তেলিপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক চরম হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে বাড়িতে ঈদের আনন্দ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই প্রিয়জন হারানোর বুকফাটা আহাজারি। দুই প্রিয় সন্তান ও বন্ধুকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পুরো জনপদ।

প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন,

“সবই আল্লাহর লিখন। ছোটবেলা থেকে ওরা একসাথে ছিল, আজ একসাথে চলেও গেল। কবরেও তারা পাশাপাশি রইল।”

তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমীন জানান, কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল মাগরিবের নামাজ শেষে স্থানীয় খিয়ারডাঙ্গা কবরস্থানে পাশাপাশি দুটি কবরে দুই বন্ধুকে দাফন করা হয়।

অভাবের সংসারে আলো ছড়াতে যারা শহর পাড়ি দিয়েছিল, ঈদের আনন্দ ভাগ করতে এসে তাদের এমন আকস্মিক বিদায় কেউ মেনে নিতে পারছেন না। চিরচেনা সেই ধুলোমাখা পথ আর যমুনেশ্বরীর পাড় আজীবন সাক্ষী হয়ে রইল দুই বন্ধুর এক অবিচ্ছেদ্য ও চিরন্তন বন্ধুত্বের গল্পের।


জুফাস নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশক: খাদেমুল বাশার রিফাত


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জুফাস নিউজ