নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে রেলওয়ের ব্রিটিশ আমলের শতবর্ষী ৩৩টি রেইনট্রি ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেকোনো সময় এগুলো উপড়ে বা ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় গাছগুলো কাটার চূড়ান্ত অনুমতি দিয়েছে বিভাগীয় বন বিভাগ। তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব গাছের বদলে চলতি বর্ষা মৌসুমেই শহরজুড়ে পাঁচ হাজার গাছের চারা লাগানোর এক বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
আজ শনিবার (১১ জুলাই) গাছগুলো কাটার বিষয়ে বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের হাতে এসে পৌঁছেছে বলে রেল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৭০ সালে তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বৃহত্তম কারখানাটি সৈয়দপুরে গড়ে ওঠে। তৎকালীন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এই জৌলুশপূর্ণ শহরে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করা হয়েছিল। বর্তমানে শহরের অফিসার্স কলোনি, সাহেবপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, মুন্সিপাড়া, হাতিখানা, শহীদ আতিয়ার কলোনি, গোলাহাট ও বাঁশবাড়ী এলাকার রেলওয়ে কলোনিগুলোয় প্রায় হাজারখানেক এমন শতবর্ষী বৃক্ষ রয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন পার হওয়ায় এর মধ্যে ৩৩টি গাছ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত এসব গাছের অধিকাংশই রেইনট্রি, যা প্রায় মৃত এবং গোড়া ভঙ্গুর ও খোলসযুক্ত হয়ে পড়েছে।
রেলওয়ে পূর্ত বিভাগ জানায়, গত মে মাসে সামান্য বাতাসে অফিসার্স কলোনি এলাকায় রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়কের (ডিএস) বাসভবনের একটি বড় গাছ বিমানবন্দর সড়কের ওপর উপড়ে পড়ে। এর আগে পাঁচমাথা মোড় এলাকায় এবং গত ৩০ জুন জিআরপি মোড়ে আরও দুটি বিশাল গাছ ভেঙে পড়ে। সবশেষ গতকাল শুক্রবার রাতেও সৈয়দপুর বিমানবন্দর সড়কে লায়ন্স স্কুল ও কলেজের কাছে একটি শতবর্ষী পাকুড় গাছের বড় ডাল ভেঙে পড়ে। এসব ঘটনায় অলৌকিকভাবে কেউ হতাহত না হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সৈয়দপুরের শিল্পপতি সিদ্দিকুল আলম বলেন, "জন্মের পর থেকে এই বিশাল বিশাল রেইনট্রি দেখছি। কিন্তু এখন এগুলো মারা যাচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে। গাছগুলো কেটে ফেলতে আমরা রেলওয়ের কাছে বহুবার দাবি জানিয়েছি।"
একই সুর মিলিয়ে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ম আ শামীম বলেন, "রেলের কিছু কিছু গাছ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণ মানুষের জানমালের স্বার্থে এগুলো কেটে ফেলাই ভালো হবে। তবে আমরা চাইব বন বিভাগের নীতিমালা ও আইনি প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করেই যেন কাজটা করা হয়।"
সরকারি গাছ কাটার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা থাকায় দীর্ঘদিন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। পরবর্তীতে গত ১৮ মে গাছগুলো অপসারণের জন্য রংপুরে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেন সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী তহিদুল ইসলাম।
এর প্রেক্ষিতে বন বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে ৩৩টি গাছকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এর মূল্য নির্ধারণ করে। গত ১১ জুন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গাছগুলো কাটার সবুজ সংকেত দেওয়া হয়।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম জানান, "রেলওয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বার্থে ৩৩টি গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এর শর্ত হিসেবে কাটা গাছের বিপরীতে অন্তত তিন গুণ নতুন বৃক্ষরোপণ করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।"
বন বিভাগ তিন গুণ গাছ লাগানোর নির্দেশনা দিলেও পরিবেশের সুরক্ষায় আরও বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ৩৩টি গাছের বিপরীতে তারা ৫ হাজার গাছের চারা রোপণ করবে— যা নিয়মের চেয়েও প্রায় ৫০ গুণ বেশি।
সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের জ্যেষ্ট সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী তহিদুল ইসলাম বলেন, "জনস্বার্থে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো দ্রুত কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে আমরা পরিবেশের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিন গুণ নয়, চলতি বর্ষা মৌসুমেই শহরজুড়ে পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে এই চারা রোপণ কর্মসূচি শুরু হবে।"
বিষয় : সৈয়দপুরের খবর

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬
নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে রেলওয়ের ব্রিটিশ আমলের শতবর্ষী ৩৩টি রেইনট্রি ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেকোনো সময় এগুলো উপড়ে বা ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় গাছগুলো কাটার চূড়ান্ত অনুমতি দিয়েছে বিভাগীয় বন বিভাগ। তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব গাছের বদলে চলতি বর্ষা মৌসুমেই শহরজুড়ে পাঁচ হাজার গাছের চারা লাগানোর এক বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
আজ শনিবার (১১ জুলাই) গাছগুলো কাটার বিষয়ে বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের হাতে এসে পৌঁছেছে বলে রেল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৭০ সালে তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বৃহত্তম কারখানাটি সৈয়দপুরে গড়ে ওঠে। তৎকালীন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এই জৌলুশপূর্ণ শহরে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করা হয়েছিল। বর্তমানে শহরের অফিসার্স কলোনি, সাহেবপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, মুন্সিপাড়া, হাতিখানা, শহীদ আতিয়ার কলোনি, গোলাহাট ও বাঁশবাড়ী এলাকার রেলওয়ে কলোনিগুলোয় প্রায় হাজারখানেক এমন শতবর্ষী বৃক্ষ রয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন পার হওয়ায় এর মধ্যে ৩৩টি গাছ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত এসব গাছের অধিকাংশই রেইনট্রি, যা প্রায় মৃত এবং গোড়া ভঙ্গুর ও খোলসযুক্ত হয়ে পড়েছে।
রেলওয়ে পূর্ত বিভাগ জানায়, গত মে মাসে সামান্য বাতাসে অফিসার্স কলোনি এলাকায় রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়কের (ডিএস) বাসভবনের একটি বড় গাছ বিমানবন্দর সড়কের ওপর উপড়ে পড়ে। এর আগে পাঁচমাথা মোড় এলাকায় এবং গত ৩০ জুন জিআরপি মোড়ে আরও দুটি বিশাল গাছ ভেঙে পড়ে। সবশেষ গতকাল শুক্রবার রাতেও সৈয়দপুর বিমানবন্দর সড়কে লায়ন্স স্কুল ও কলেজের কাছে একটি শতবর্ষী পাকুড় গাছের বড় ডাল ভেঙে পড়ে। এসব ঘটনায় অলৌকিকভাবে কেউ হতাহত না হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সৈয়দপুরের শিল্পপতি সিদ্দিকুল আলম বলেন, "জন্মের পর থেকে এই বিশাল বিশাল রেইনট্রি দেখছি। কিন্তু এখন এগুলো মারা যাচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে। গাছগুলো কেটে ফেলতে আমরা রেলওয়ের কাছে বহুবার দাবি জানিয়েছি।"
একই সুর মিলিয়ে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ম আ শামীম বলেন, "রেলের কিছু কিছু গাছ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণ মানুষের জানমালের স্বার্থে এগুলো কেটে ফেলাই ভালো হবে। তবে আমরা চাইব বন বিভাগের নীতিমালা ও আইনি প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করেই যেন কাজটা করা হয়।"
সরকারি গাছ কাটার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা থাকায় দীর্ঘদিন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। পরবর্তীতে গত ১৮ মে গাছগুলো অপসারণের জন্য রংপুরে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেন সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী তহিদুল ইসলাম।
এর প্রেক্ষিতে বন বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে ৩৩টি গাছকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এর মূল্য নির্ধারণ করে। গত ১১ জুন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গাছগুলো কাটার সবুজ সংকেত দেওয়া হয়।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম জানান, "রেলওয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বার্থে ৩৩টি গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এর শর্ত হিসেবে কাটা গাছের বিপরীতে অন্তত তিন গুণ নতুন বৃক্ষরোপণ করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।"
বন বিভাগ তিন গুণ গাছ লাগানোর নির্দেশনা দিলেও পরিবেশের সুরক্ষায় আরও বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ৩৩টি গাছের বিপরীতে তারা ৫ হাজার গাছের চারা রোপণ করবে— যা নিয়মের চেয়েও প্রায় ৫০ গুণ বেশি।
সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের জ্যেষ্ট সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী তহিদুল ইসলাম বলেন, "জনস্বার্থে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো দ্রুত কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে আমরা পরিবেশের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিন গুণ নয়, চলতি বর্ষা মৌসুমেই শহরজুড়ে পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে এই চারা রোপণ কর্মসূচি শুরু হবে।"

আপনার মতামত লিখুন