রংপুর    শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জুফাস নিউজ

সরকার বদলায়, নেতা বদলায়—রাজনীতির চরিত্র কেন বদলায় না?

সরকার বদলায়, নেতা বদলায়—রাজনীতির চরিত্র কেন বদলায় না?
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন নতুন কোনো শব্দ নয়। সরকার বদলেছে, প্রধানমন্ত্রী বদলেছেন, মন্ত্রিসভা বদলেছে, সংসদ বদলেছে, বিরোধী দল বদলেছে। কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে, কখনো গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে, কখনো রাজনৈতিক সংকটের চাপে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত—নেতা বদলালেও রাজনীতির চরিত্র কেন বদলায় না?

এই প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বরং বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলার দিকে তাকিয়ে নিজেদের সামনে রাখা একটি আয়না।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন যাত্রার প্রত্যাশা করেছিল। এরপর বহু নির্বাচন হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই আমরা একই ধরনের কিছু রাজনৈতিক প্রবণতা ফিরে আসতে দেখেছি—ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয় আনুগত্যের অতিমূল্যায়ন, বিরোধী মতকে সন্দেহের চোখে দেখা, প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার প্রবণতা এবং ক্ষমতায় থাকাকালে জবাবদিহির প্রতি অনীহা। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা কি সরকার পরিবর্তন করেছি, নাকি শুধু সরকারের মালিক পরিবর্তন করেছি? ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছিল। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সেই সময়ে রাষ্ট্র সংস্কার হয়ে ওঠে জাতীয় আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হয়। পরে আরও কয়েকটি খাতেও সংস্কার কমিশন করা হয়।


এটি ছিল একটি বড় সুযোগ। কারণ একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণত জনগণ শুধু নতুন সরকার চায় না; তারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিও চায়।

কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি এত সহজে বদলায়?

সম্ভবত না।

কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোনো এক ব্যক্তির হাতে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় দলীয় আচরণ, প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্বের মানসিকতা, রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক এবং জনগণের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট সম্ভবত এখানেই।

আমরা ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রকে নিজেদের সাফল্যের মাপকাঠি দিয়ে দেখি, আর বিরোধী দলে থাকলে একই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলি। ক্ষমতায় থাকা দল মনে করে তারা দেশ পরিচালনার একমাত্র বৈধ শক্তি; বিরোধী দল মনে করে ক্ষমতাসীনদের সরানোই তাদের প্রধান রাজনৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু এর মাঝখানে যে রাষ্ট্র, যে প্রতিষ্ঠান এবং যে জনগণ—তাদের জায়গাটি কোথায়?

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ক্ষমতায় থাকা নয়; ক্ষমতা হারানোর পরও প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করতে পারা। একটি দল পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবে, এরপর জনগণ চাইলে তাকে সরিয়ে দেবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল অনেক সময় রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ফলে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা এবং বিরোধী অবস্থানে ক্ষমতায় ফেরার সংগ্রাম—দুটিই কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার বানিয়েছে। এই সংস্কৃতি ভাঙা জরুরি। কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের নয়। সরকার কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন কিংবা সংসদও কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলো জনগণের প্রতিষ্ঠান।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার নির্বাচিত সরকারের অধীনে ফিরেছে। বিএনপি ৩০০ সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২১০টি আসন পেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে সংসদে এসেছে।

এই নির্বাচন তাই শুধু একটি নতুন সরকারের জন্ম দেয়নি; বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর আরেকটি সুযোগও তৈরি করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই সুযোগ কি এবার কাজে লাগানো হবে?

নতুন সরকার যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে জনগণের হতাশা খুব দ্রুত ফিরে আসবে। আর বিরোধী দল যদি শুধু সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করাকেই রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য বানায়, তাহলেও গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না।

সরকারের কাজ সরকার করা। বিরোধী দলের কাজ বিরোধিতা করা—কিন্তু সেই বিরোধিতা হতে হবে দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও রাষ্ট্রের স্বার্থকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা হলো, বিরোধী দলের ভূমিকা অনেক সময় সংসদের ভেতরের কার্যকর নজরদারির পরিবর্তে রাজপথকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। আবার ক্ষমতাসীন দলও অনেক সময় বিরোধী মতকে গণতান্ত্রিক সম্পদ হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক বাধা হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে সংসদ দুর্বল হয়, রাজনৈতিক সংলাপ দুর্বল হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজপথই হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক মঞ্চ। এটি কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়।

একটি শক্তিশালী সরকার দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে দরকার শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও কার্যকর বিরোধী দল।

কারণ বিরোধী দল দুর্বল হলে সরকারও শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। কেননা ক্ষমতার বাইরে থেকে যে প্রশ্নগুলো করা দরকার, সেগুলো না থাকলে ক্ষমতার ভেতরে আত্মতুষ্টি তৈরি হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি—ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যে দল বিরোধী দলের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে, ক্ষমতায় গিয়ে কখনো কখনো সেই একই দল বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করেছে। আবার যে দল বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবি করেছে, ক্ষমতায় গিয়ে তারাও সবসময় সেই মানদণ্ডে নিজেদের ধরে রাখতে পারেনি। এই দ্বৈত মানসিকতা বদলানো দরকার।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—আপনি আপনার প্রতিপক্ষের জন্য যে অধিকার চান, ক্ষমতায় গিয়ে সেই অধিকার তাকে দিতে পারেন কি না। আপনি যদি নিজের দলের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চান, তাহলে আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরও সেই অধিকার স্বীকার করতে হবে। আপনি যদি নিজের দলের সভা-সমাবেশের অধিকার চান, তাহলে অন্য দলের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। আপনি যদি নিজের কর্মীর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করেন, তাহলে প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করতে হবে। এটাই রাজনৈতিক নৈতিকতা।

কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে নীতির চেয়ে দলীয় সুবিধা অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। আর এখানেই চরিত্রের সংকট।

রাজনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। রাজনৈতিক দল যত বড়ই হোক, নেতৃত্ব যদি কয়েকজন ব্যক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না। দলের ভেতরে মতের বৈচিত্র্য কমে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীভূত হয়। তোষামোদ বাড়ে। আর নেতা ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন।

একজন নেতার চারপাশে যদি শুধু প্রশংসাকারীরা থাকে, তাহলে তিনি দেশের বাস্তব চিত্র কীভাবে জানবেন?

রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষটি তাই সবসময় প্রশংসাকারী নন। বরং প্রয়োজন সেই মানুষটির, যিনি ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন—‘স্যার, এই সিদ্ধান্তটি ভুল।’ কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন মানুষ অনেক সময় টেকে না।

দলীয় আনুগত্যের অর্থ যদি হয়ে যায় প্রশ্নহীন আনুগত্য, তাহলে সেখানে গণতন্ত্রের জায়গা সংকুচিত হয়। দল শক্তিশালী হয়তো হয়, কিন্তু গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না।

রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনাতেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ সময়ে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলো নির্বাচন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও সংবিধানসহ রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও কাজ করেছে।

কিন্তু কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না, যদি রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের আচরণে সংস্কার না আসে।

আইন বদলানো যায়। সংবিধান সংশোধন করা যায়। প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা যায়। কিন্তু রাজনৈতিক মানসিকতা না বদলালে পুরোনো সংস্কৃতি নতুন কাঠামোর ভেতরেও ফিরে আসতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে জরুরি সংস্কার সম্ভবত শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান সংস্কার নয়—রাজনৈতিক আচরণের সংস্কার।

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে দেশবিরোধী বানানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক মতভেদকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত করা যাবে না। নির্বাচনে পরাজয়কে অপমান এবং বিজয়কে চূড়ান্ত বৈধতা হিসেবে দেখা যাবে না।

নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে জনগণের কাছ থেকে পাঁচ বছরের জন্য একটি দায়িত্ব পাওয়া; জনগণের ওপর পাঁচ বছরের মালিকানা পাওয়া নয়।

এই পার্থক্যটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে। একইভাবে বিরোধী দলকেও বুঝতে হবে—সরকারের প্রতিটি কাজের বিরোধিতা করা আর সরকারের ভুলের বিরোধিতা করা এক জিনিস নয়। দেশ ভালো করলে সেটিকে স্বীকার করা এবং ভুল করলে সমালোচনা করা—এটাই দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতি।

রাজনীতিতে দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বক্তৃতায় নয়; নিজের দলের স্বার্থের ওপরে রাষ্ট্রের স্বার্থকে স্থান দিতে পারায়।

বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ রাজনীতিকে পুরোনো চোখে দেখতে চায় না। তারা প্রশ্ন করতে চায়। তারা জবাবদিহি চায়। তারা ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে বড় দেখতে চায়। তারা চায় না রাজনীতি মানেই সংঘাত, মিছিল, পাল্টা মিছিল, মামলা, গ্রেপ্তার, প্রতিশোধ এবং ক্ষমতার লড়াই হোক।

তারা এমন রাজনীতি চায় যেখানে সংসদে বিতর্ক হবে, নীতির প্রতিযোগিতা হবে, যোগ্যতার মূল্য থাকবে এবং জনগণ নির্বাচনের পরও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ থাকবে।

এই প্রত্যাশাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে দেখিয়েছে—কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা যত শক্তিশালীই মনে হোক, জনগণের আস্থা হারালে তার ভিত দুর্বল হয়ে যায়। আর ২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ আবার একটি নতুন সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে। এখন সেই আস্থা ধরে রাখার দায়িত্ব সরকারের, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর।

সরকার বদলেছে। নেতা বদলেছেন। সংসদ বদলেছে। এখন বদলাতে হবে রাজনীতির ভাষা।

বদলাতে হবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেখার চোখ। বদলাতে হবে ক্ষমতাকে নিজের সম্পদ মনে করার মানসিকতা।

বদলাতে হবে ‘আমার লোক’ আর ‘তোমার লোক’-এর রাজনীতি।

বদলাতে হবে সেই ধারণা—ক্ষমতায় থাকলে সব বৈধ, আর বিরোধী দলে থাকলে সব অন্যায়।

বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ক্ষমতায় কে আছে, সেটি নয়। বরং ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে কতটা সম্মান করে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষটির অধিকার কতটা নিশ্চিত করে—সেটিই আসল পরীক্ষা।

আমরা বহুবার সরকার বদলেছি। বহুবার নেতা বদলেছি। বহুবার নতুন স্লোগান শুনেছি। এবার যদি সত্যিই পরিবর্তন চাই, তাহলে শুধু মুখ বদলালে হবে না; রাজনীতির আচরণ বদলাতে হবে।

কারণ একই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর নতুন নেতা বসালে নতুন বাংলাদেশ তৈরি হয় না। নতুন বাংলাদেশ তৈরি হবে তখনই, যখন ক্ষমতায় থাকা দল বুঝবে—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। বিরোধী দল বুঝবে—বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, আবার সরকারবিরোধিতাও রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। আর জনগণ বুঝবে—ভোট দেওয়া গণতন্ত্রের শেষ নয়; জবাবদিহি দাবি করাও গণতন্ত্রের অংশ।

সবশেষে রাজনীতিবিদদের জন্য একটি সরল প্রশ্ন রেখে যেতে চাই— আপনি ক্ষমতায় থাকলে যে বাংলাদেশ চান, বিরোধী দলে থাকলেও কি একই বাংলাদেশ চান?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে সেখান থেকেই শুরু হতে পারে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে সরকার বদলাবে, নেতা বদলাবে—কিন্তু রাজনীতির চরিত্র বদলাবে না।

লেখক পরিচিতি: জাহিদ ইকবাল, সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
জুফাস নিউজ

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সরকার বদলায়, নেতা বদলায়—রাজনীতির চরিত্র কেন বদলায় না?

প্রকাশের তারিখ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন নতুন কোনো শব্দ নয়। সরকার বদলেছে, প্রধানমন্ত্রী বদলেছেন, মন্ত্রিসভা বদলেছে, সংসদ বদলেছে, বিরোধী দল বদলেছে। কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে, কখনো গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে, কখনো রাজনৈতিক সংকটের চাপে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত—নেতা বদলালেও রাজনীতির চরিত্র কেন বদলায় না?

এই প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বরং বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলার দিকে তাকিয়ে নিজেদের সামনে রাখা একটি আয়না।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন যাত্রার প্রত্যাশা করেছিল। এরপর বহু নির্বাচন হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই আমরা একই ধরনের কিছু রাজনৈতিক প্রবণতা ফিরে আসতে দেখেছি—ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয় আনুগত্যের অতিমূল্যায়ন, বিরোধী মতকে সন্দেহের চোখে দেখা, প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার প্রবণতা এবং ক্ষমতায় থাকাকালে জবাবদিহির প্রতি অনীহা। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা কি সরকার পরিবর্তন করেছি, নাকি শুধু সরকারের মালিক পরিবর্তন করেছি? ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছিল। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সেই সময়ে রাষ্ট্র সংস্কার হয়ে ওঠে জাতীয় আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হয়। পরে আরও কয়েকটি খাতেও সংস্কার কমিশন করা হয়।


এটি ছিল একটি বড় সুযোগ। কারণ একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণত জনগণ শুধু নতুন সরকার চায় না; তারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিও চায়।

কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি এত সহজে বদলায়?

সম্ভবত না।

কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোনো এক ব্যক্তির হাতে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় দলীয় আচরণ, প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্বের মানসিকতা, রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক এবং জনগণের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট সম্ভবত এখানেই।

আমরা ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রকে নিজেদের সাফল্যের মাপকাঠি দিয়ে দেখি, আর বিরোধী দলে থাকলে একই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলি। ক্ষমতায় থাকা দল মনে করে তারা দেশ পরিচালনার একমাত্র বৈধ শক্তি; বিরোধী দল মনে করে ক্ষমতাসীনদের সরানোই তাদের প্রধান রাজনৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু এর মাঝখানে যে রাষ্ট্র, যে প্রতিষ্ঠান এবং যে জনগণ—তাদের জায়গাটি কোথায়?

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ক্ষমতায় থাকা নয়; ক্ষমতা হারানোর পরও প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করতে পারা। একটি দল পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবে, এরপর জনগণ চাইলে তাকে সরিয়ে দেবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল অনেক সময় রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ফলে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা এবং বিরোধী অবস্থানে ক্ষমতায় ফেরার সংগ্রাম—দুটিই কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার বানিয়েছে। এই সংস্কৃতি ভাঙা জরুরি। কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের নয়। সরকার কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন কিংবা সংসদও কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলো জনগণের প্রতিষ্ঠান।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার নির্বাচিত সরকারের অধীনে ফিরেছে। বিএনপি ৩০০ সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২১০টি আসন পেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে সংসদে এসেছে।

এই নির্বাচন তাই শুধু একটি নতুন সরকারের জন্ম দেয়নি; বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর আরেকটি সুযোগও তৈরি করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই সুযোগ কি এবার কাজে লাগানো হবে?

নতুন সরকার যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে জনগণের হতাশা খুব দ্রুত ফিরে আসবে। আর বিরোধী দল যদি শুধু সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করাকেই রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য বানায়, তাহলেও গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না।

সরকারের কাজ সরকার করা। বিরোধী দলের কাজ বিরোধিতা করা—কিন্তু সেই বিরোধিতা হতে হবে দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও রাষ্ট্রের স্বার্থকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা হলো, বিরোধী দলের ভূমিকা অনেক সময় সংসদের ভেতরের কার্যকর নজরদারির পরিবর্তে রাজপথকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। আবার ক্ষমতাসীন দলও অনেক সময় বিরোধী মতকে গণতান্ত্রিক সম্পদ হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক বাধা হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে সংসদ দুর্বল হয়, রাজনৈতিক সংলাপ দুর্বল হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজপথই হয়ে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক মঞ্চ। এটি কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়।

একটি শক্তিশালী সরকার দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে দরকার শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও কার্যকর বিরোধী দল।

কারণ বিরোধী দল দুর্বল হলে সরকারও শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। কেননা ক্ষমতার বাইরে থেকে যে প্রশ্নগুলো করা দরকার, সেগুলো না থাকলে ক্ষমতার ভেতরে আত্মতুষ্টি তৈরি হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি—ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যে দল বিরোধী দলের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে, ক্ষমতায় গিয়ে কখনো কখনো সেই একই দল বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করেছে। আবার যে দল বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবি করেছে, ক্ষমতায় গিয়ে তারাও সবসময় সেই মানদণ্ডে নিজেদের ধরে রাখতে পারেনি। এই দ্বৈত মানসিকতা বদলানো দরকার।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—আপনি আপনার প্রতিপক্ষের জন্য যে অধিকার চান, ক্ষমতায় গিয়ে সেই অধিকার তাকে দিতে পারেন কি না। আপনি যদি নিজের দলের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চান, তাহলে আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরও সেই অধিকার স্বীকার করতে হবে। আপনি যদি নিজের দলের সভা-সমাবেশের অধিকার চান, তাহলে অন্য দলের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। আপনি যদি নিজের কর্মীর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করেন, তাহলে প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করতে হবে। এটাই রাজনৈতিক নৈতিকতা।

কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে নীতির চেয়ে দলীয় সুবিধা অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। আর এখানেই চরিত্রের সংকট।

রাজনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। রাজনৈতিক দল যত বড়ই হোক, নেতৃত্ব যদি কয়েকজন ব্যক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না। দলের ভেতরে মতের বৈচিত্র্য কমে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীভূত হয়। তোষামোদ বাড়ে। আর নেতা ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন।

একজন নেতার চারপাশে যদি শুধু প্রশংসাকারীরা থাকে, তাহলে তিনি দেশের বাস্তব চিত্র কীভাবে জানবেন?

রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষটি তাই সবসময় প্রশংসাকারী নন। বরং প্রয়োজন সেই মানুষটির, যিনি ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন—‘স্যার, এই সিদ্ধান্তটি ভুল।’ কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন মানুষ অনেক সময় টেকে না।

দলীয় আনুগত্যের অর্থ যদি হয়ে যায় প্রশ্নহীন আনুগত্য, তাহলে সেখানে গণতন্ত্রের জায়গা সংকুচিত হয়। দল শক্তিশালী হয়তো হয়, কিন্তু গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না।

রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনাতেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ সময়ে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলো নির্বাচন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও সংবিধানসহ রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও কাজ করেছে।

কিন্তু কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না, যদি রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের আচরণে সংস্কার না আসে।

আইন বদলানো যায়। সংবিধান সংশোধন করা যায়। প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা যায়। কিন্তু রাজনৈতিক মানসিকতা না বদলালে পুরোনো সংস্কৃতি নতুন কাঠামোর ভেতরেও ফিরে আসতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে জরুরি সংস্কার সম্ভবত শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান সংস্কার নয়—রাজনৈতিক আচরণের সংস্কার।

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে দেশবিরোধী বানানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক মতভেদকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত করা যাবে না। নির্বাচনে পরাজয়কে অপমান এবং বিজয়কে চূড়ান্ত বৈধতা হিসেবে দেখা যাবে না।

নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে জনগণের কাছ থেকে পাঁচ বছরের জন্য একটি দায়িত্ব পাওয়া; জনগণের ওপর পাঁচ বছরের মালিকানা পাওয়া নয়।

এই পার্থক্যটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে। একইভাবে বিরোধী দলকেও বুঝতে হবে—সরকারের প্রতিটি কাজের বিরোধিতা করা আর সরকারের ভুলের বিরোধিতা করা এক জিনিস নয়। দেশ ভালো করলে সেটিকে স্বীকার করা এবং ভুল করলে সমালোচনা করা—এটাই দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতি।

রাজনীতিতে দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বক্তৃতায় নয়; নিজের দলের স্বার্থের ওপরে রাষ্ট্রের স্বার্থকে স্থান দিতে পারায়।

বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ রাজনীতিকে পুরোনো চোখে দেখতে চায় না। তারা প্রশ্ন করতে চায়। তারা জবাবদিহি চায়। তারা ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে বড় দেখতে চায়। তারা চায় না রাজনীতি মানেই সংঘাত, মিছিল, পাল্টা মিছিল, মামলা, গ্রেপ্তার, প্রতিশোধ এবং ক্ষমতার লড়াই হোক।

তারা এমন রাজনীতি চায় যেখানে সংসদে বিতর্ক হবে, নীতির প্রতিযোগিতা হবে, যোগ্যতার মূল্য থাকবে এবং জনগণ নির্বাচনের পরও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ থাকবে।

এই প্রত্যাশাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে দেখিয়েছে—কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা যত শক্তিশালীই মনে হোক, জনগণের আস্থা হারালে তার ভিত দুর্বল হয়ে যায়। আর ২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ আবার একটি নতুন সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে। এখন সেই আস্থা ধরে রাখার দায়িত্ব সরকারের, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর।

সরকার বদলেছে। নেতা বদলেছেন। সংসদ বদলেছে। এখন বদলাতে হবে রাজনীতির ভাষা।

বদলাতে হবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেখার চোখ। বদলাতে হবে ক্ষমতাকে নিজের সম্পদ মনে করার মানসিকতা।

বদলাতে হবে ‘আমার লোক’ আর ‘তোমার লোক’-এর রাজনীতি।

বদলাতে হবে সেই ধারণা—ক্ষমতায় থাকলে সব বৈধ, আর বিরোধী দলে থাকলে সব অন্যায়।

বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ক্ষমতায় কে আছে, সেটি নয়। বরং ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে কতটা সম্মান করে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষটির অধিকার কতটা নিশ্চিত করে—সেটিই আসল পরীক্ষা।

আমরা বহুবার সরকার বদলেছি। বহুবার নেতা বদলেছি। বহুবার নতুন স্লোগান শুনেছি। এবার যদি সত্যিই পরিবর্তন চাই, তাহলে শুধু মুখ বদলালে হবে না; রাজনীতির আচরণ বদলাতে হবে।

কারণ একই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর নতুন নেতা বসালে নতুন বাংলাদেশ তৈরি হয় না। নতুন বাংলাদেশ তৈরি হবে তখনই, যখন ক্ষমতায় থাকা দল বুঝবে—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। বিরোধী দল বুঝবে—বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, আবার সরকারবিরোধিতাও রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। আর জনগণ বুঝবে—ভোট দেওয়া গণতন্ত্রের শেষ নয়; জবাবদিহি দাবি করাও গণতন্ত্রের অংশ।

সবশেষে রাজনীতিবিদদের জন্য একটি সরল প্রশ্ন রেখে যেতে চাই— আপনি ক্ষমতায় থাকলে যে বাংলাদেশ চান, বিরোধী দলে থাকলেও কি একই বাংলাদেশ চান?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে সেখান থেকেই শুরু হতে পারে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে সরকার বদলাবে, নেতা বদলাবে—কিন্তু রাজনীতির চরিত্র বদলাবে না।

লেখক পরিচিতি: জাহিদ ইকবাল, সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।


জুফাস নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশক: খাদেমুল বাশার রিফাত


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জুফাস নিউজ