রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার শিক্ষার আলোর মূল বাতিঘর বলা হতো ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত তারাগঞ্জ ও/এ (ওয়াকফ এস্টেট) মডেল উচ্চ বিদ্যালয়কে। স্থানীয় আলহাজ টগরু মোহাম্মদ প্রামাণিকের দান করা প্রায় সাড়ে তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে ২০১৮ সালে জাঁকজমকভাবে সরকারীকরণ করা হয়। কিন্তু জাতীয়করণের দীর্ঘ ৭ বছর পার হলেও সরকারি সুবিধার বদলে যেন চরম অবহেলার শিকার বিদ্যালয়টি। পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে ভেঙে পড়েছে এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে।
উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক এই বিদ্যাপিঠে বর্তমানে অনুমোদিত ১৭টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৫টি প্রধান পদই খালি। এর মধ্যে খোদ প্রধান শিক্ষকের পদসহ নেই ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, ব্যবসায় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর বিষয়ভিত্তিক কোনো শিক্ষক।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ২৫ জন সহকারী শিক্ষক থাকার কথা। কিন্তু তারাগঞ্জ সরকারি মডেল স্কুলে অনুমোদিত পদই মাত্র ১৭টি, আর সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন শিক্ষক। ৬ থেকে ৮টি ক্লাসের বদলে প্রতিদিন কোনোমতে ৩ থেকে ৫টি ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।
এই চরম শিক্ষক সংকটের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে পরীক্ষার ফলাফলে:
২০২১ সালে পাসের হার: ৯৪.৫৯%
২০২৪ সালে পাসের হার: নেমে আসে ৬৪.১২% এ
২০২৫ সালে পাসের হার: ৭৭.৮% হলেও একজন শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি।
বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম সরকার আক্ষেপ করে বলে, "প্রতিদিন আমাদের ৬ থেকে ৮টি ক্লাস হওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষক না থাকায় অধিকাংশ দিন ৩ থেকে ৫টি ক্লাসের বেশি হয় না। সিলেবাস শেষ করাই এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।"
আরেক শিক্ষার্থী মোছা. জুঁই আক্তার জানায়, বিদ্যালয়টি সরকারি হলেও নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় এখন তাদের বাসা আর কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।
শুধু শিক্ষকই নয়, বিদ্যালয়ের ৬টি অনুমোদিত কর্মচারী পদের দুটি খালি। বিশেষ করে কোনো নৈশপ্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণ ও ভোকেশনাল শাখা মিলিয়ে ৫০২ জন শিক্ষার্থীর এই বৃহৎ চাপ সামলাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে কর্মরত ১২ জন শিক্ষকের।
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক বসুদেব রায় বলেন, "বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় আমাদের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। দ্রুত শিক্ষক পদায়ন করা হলে শিক্ষা কার্যক্রম আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।"
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মুসা সরকার জানান, "প্রধান শিক্ষকের পদসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষক না থাকায় আমরা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছি না।"
জাতীয়করণের পর এত বছর পার হলেও কেন শিক্ষক পদায়ন হচ্ছে না— তা নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহীনুর রহমান বলেন, "সরকারি হওয়ার পর এখানে বিসিএস (নন-ক্যাডার) থেকে নতুন কোনো শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি। আবার বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (NTRCA) মাধ্যমেও শিক্ষক নিয়োগের কোনো আইনি সুযোগ নেই। এই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।"
তবে সংকট কাটাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাব্বর হোসেন। তিনি বলেন, "শিক্ষক সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় পদায়নের চাহিদাপত্র ও সুপারিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দপ্তরে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই শূন্য পদে নিয়োগ বা পদায়ন নিশ্চিত হবে।"
উপজেলার অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, অতি দ্রুত শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া না হলে অঞ্চলের একমাত্র সরকারি স্কুলের সুনাম ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দুটোই মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার শিক্ষার আলোর মূল বাতিঘর বলা হতো ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত তারাগঞ্জ ও/এ (ওয়াকফ এস্টেট) মডেল উচ্চ বিদ্যালয়কে। স্থানীয় আলহাজ টগরু মোহাম্মদ প্রামাণিকের দান করা প্রায় সাড়ে তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে ২০১৮ সালে জাঁকজমকভাবে সরকারীকরণ করা হয়। কিন্তু জাতীয়করণের দীর্ঘ ৭ বছর পার হলেও সরকারি সুবিধার বদলে যেন চরম অবহেলার শিকার বিদ্যালয়টি। পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে ভেঙে পড়েছে এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে।
উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক এই বিদ্যাপিঠে বর্তমানে অনুমোদিত ১৭টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৫টি প্রধান পদই খালি। এর মধ্যে খোদ প্রধান শিক্ষকের পদসহ নেই ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, ব্যবসায় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর বিষয়ভিত্তিক কোনো শিক্ষক।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ২৫ জন সহকারী শিক্ষক থাকার কথা। কিন্তু তারাগঞ্জ সরকারি মডেল স্কুলে অনুমোদিত পদই মাত্র ১৭টি, আর সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন শিক্ষক। ৬ থেকে ৮টি ক্লাসের বদলে প্রতিদিন কোনোমতে ৩ থেকে ৫টি ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।
এই চরম শিক্ষক সংকটের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে পরীক্ষার ফলাফলে:
২০২১ সালে পাসের হার: ৯৪.৫৯%
২০২৪ সালে পাসের হার: নেমে আসে ৬৪.১২% এ
২০২৫ সালে পাসের হার: ৭৭.৮% হলেও একজন শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি।
বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম সরকার আক্ষেপ করে বলে, "প্রতিদিন আমাদের ৬ থেকে ৮টি ক্লাস হওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষক না থাকায় অধিকাংশ দিন ৩ থেকে ৫টি ক্লাসের বেশি হয় না। সিলেবাস শেষ করাই এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।"
আরেক শিক্ষার্থী মোছা. জুঁই আক্তার জানায়, বিদ্যালয়টি সরকারি হলেও নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় এখন তাদের বাসা আর কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।
শুধু শিক্ষকই নয়, বিদ্যালয়ের ৬টি অনুমোদিত কর্মচারী পদের দুটি খালি। বিশেষ করে কোনো নৈশপ্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণ ও ভোকেশনাল শাখা মিলিয়ে ৫০২ জন শিক্ষার্থীর এই বৃহৎ চাপ সামলাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে কর্মরত ১২ জন শিক্ষকের।
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক বসুদেব রায় বলেন, "বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় আমাদের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। দ্রুত শিক্ষক পদায়ন করা হলে শিক্ষা কার্যক্রম আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।"
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মুসা সরকার জানান, "প্রধান শিক্ষকের পদসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষক না থাকায় আমরা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছি না।"
জাতীয়করণের পর এত বছর পার হলেও কেন শিক্ষক পদায়ন হচ্ছে না— তা নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহীনুর রহমান বলেন, "সরকারি হওয়ার পর এখানে বিসিএস (নন-ক্যাডার) থেকে নতুন কোনো শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি। আবার বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (NTRCA) মাধ্যমেও শিক্ষক নিয়োগের কোনো আইনি সুযোগ নেই। এই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।"
তবে সংকট কাটাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাব্বর হোসেন। তিনি বলেন, "শিক্ষক সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় পদায়নের চাহিদাপত্র ও সুপারিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দপ্তরে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই শূন্য পদে নিয়োগ বা পদায়ন নিশ্চিত হবে।"
উপজেলার অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, অতি দ্রুত শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া না হলে অঞ্চলের একমাত্র সরকারি স্কুলের সুনাম ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দুটোই মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন