রংপুর    সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
জুফাস নিউজ
প্রকাশ : রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

উলিপুরে ৮ বছরের শিশুর কাঁধে ছয়জনের পরিবারের বোঝা

উলিপুরে ৮ বছরের শিশুর কাঁধে ছয়জনের পরিবারের বোঝা
বছরের শিশুর কাঁধে ছয়জনের পরিবারের বোঝা। ছবি: সংগৃহীত

যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, রঙিন স্কুলব্যাগ আর বন্ধুদের সাথে খেলার আনন্দময় শৈশব—সেই ৮ বছর বয়সেই কঠিন বাস্তবতা জীবনের এক নির্মম লড়াইয়ে নামিয়ে দিয়েছে হৃদয় চন্দ্র সরকারকে। উলিপুরের এই শিশুটি আজ আর কেবল কোনো শিশু নয়; বরং তার ওপর ভর করে টিকে আছে ৬ সদস্যের একটি আস্ত পরিবার।

কথাটি শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, চরম দারিদ্র্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানা কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের নাগদহ গ্রামের সুশান্ত কুমার সরকারের পরিবারে এটিই এখন প্রতিদিনের নির্মম সত্য।

নাগদহ গ্রামের একটি ভাঙাচোরা ঘরে বসবাস করেন সুশান্ত কুমার সরকার ও তাঁর পরিবার। পরিবারের ৬ সদস্যের মধ্যে সুশান্ত কুমার নিজে এবং তাঁর দুই সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী। হাত ও পায়ের জটিলতার কারণে স্বাভাবিক কাজ করার শক্তি নেই সুশান্তের।

প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর হোসেনের সহায়তায় সুশান্ত পার্শ্ববর্তী চিলমারী উপজেলার একটি রুটি কারখানায় কাজের সুযোগ পান। শারীরিক অক্ষমতার কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তিনি পুরোপুরি কাজ করতে পারেন না। তবুও পারিবারিক দুরবস্থা দেখে সহকর্মীদের অনুরোধে মালিক তাঁকে সামান্য বেতনে রেখেছেন। কিন্তু সেই সামান্য আয়ে তাঁর নিজের যাতায়াত ও খরচই মেটে না। ফলে সংসার চালাতে সুশান্তের স্ত্রী শিখা রানীকে অন্যের বাড়িতে ফরমায়েশ খেটে একসের-আধসের চালের সংস্থান করতে হয়।

এমন চরম সংকটে সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয় সুশান্তের ৮ বছর বয়সী বড় ছেলে হৃদয় চন্দ্র সরকার। পরিবারের অভাব মিটাতে সে এখন উলিপুর শহরের একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে শিশু শ্রমিকের কাজ করছে। সারাদিন গ্যারেজে হারভাঙা খাটুনির পর সে যে সামান্য টাকা আয় করে, তা-ই এখন এই ৬ জনের পরিবারের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। তবে বেশিরভাগ দিনই তাদের ভাগ্যে জোটেনা পেটপুরে একবেলা খাবার; কখনো খেয়ে, আবার কখনো না খেয়েই কাটছে জীবন।

শিশুমনে হাজারও কষ্টের গল্প চেপে রাখা হৃদয় জানায়:

"আমার পরিবার চলবার জন্যই আমি এই দোকানে কাজ করছি। আমার বাবা পঙ্গু, আমার ভাইও পঙ্গু; তাই বাধ্য হয়ে পরিবারের জন্য এই কাজ করতে হচ্ছে।"

গ্যারেজ মালিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, "ছেলেটার পরিবার অনেক গরিব, বাবা প্রতিবন্ধী। পরিবারের ভাইবোনদের মধ্যে সে-ই বড়। আমার এখানে কাজ করে প্রতিদিন যে দু-চার পয়সা আয় করে, তা দিয়েই কোনোমতে তাদের সংসার চলে।"

অশ্রুসিক্ত চোখে হৃদয়ের বাবা সুশান্ত কুমার সরকার আক্ষেপ করে বলেন, "আর ১০টা মানুষ যে কাজ করতে পারে, আমি পঙ্গু হওয়ায় তা পারি না। চারটি সন্তানের মধ্যে দুটিও পঙ্গু হয়ে জন্মেছে। বাধ্য হয়ে ৮ বছরের শিশু ছেলেটাকে গ্যারেজে কাজে দিতে হয়েছে।"

হৃদয়ের মা শিখা রানী বলেন, "সংসারে অভাব লেগেই আছে। যা পাই, অনেক সময় নিজে না খেয়ে সন্তানদের মুখে তুলে দিই। সন্তানেরা কখনো ভালোমন্দ খেতে চাইলে দিতে পারি না, তখন বুকটা ফেটে যায়। সৃষ্টিকর্তা দুর্ভোগ দিয়েছেন ভেবেই মনকে সান্ত্বনা দিই।"

স্থানীয় প্রতিবেশী অরবিন্দ রায় জানান, এটি অত্যন্ত দুস্থ একটি পরিবার। আশপাশের প্রতিবেশীরাও অভাবী হওয়ায় বড় কোনো সাহায্য করতে পারছেন না। বিত্তবানরা এগিয়ে এলে পরিবারটি অন্তত ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারত।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গুনাইগাছ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) সোলাইমান আলী বলেন:

"পরিবারের মধ্যে ৩ জনই প্রতিবন্ধী। সত্যি বলতে ৮ বছরের ওই বাচ্চাটিই এখন পুরো সংসারটা টানছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হয়। তবে দেশের কোনো বিত্তবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি এই পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, তবেই পরিবারটি স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারবে।"

বিষয় : কুড়িগ্রাম খবর উলিপুর

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
জুফাস নিউজ

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬


উলিপুরে ৮ বছরের শিশুর কাঁধে ছয়জনের পরিবারের বোঝা

প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, রঙিন স্কুলব্যাগ আর বন্ধুদের সাথে খেলার আনন্দময় শৈশব—সেই ৮ বছর বয়সেই কঠিন বাস্তবতা জীবনের এক নির্মম লড়াইয়ে নামিয়ে দিয়েছে হৃদয় চন্দ্র সরকারকে। উলিপুরের এই শিশুটি আজ আর কেবল কোনো শিশু নয়; বরং তার ওপর ভর করে টিকে আছে ৬ সদস্যের একটি আস্ত পরিবার।

কথাটি শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, চরম দারিদ্র্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানা কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের নাগদহ গ্রামের সুশান্ত কুমার সরকারের পরিবারে এটিই এখন প্রতিদিনের নির্মম সত্য।

নাগদহ গ্রামের একটি ভাঙাচোরা ঘরে বসবাস করেন সুশান্ত কুমার সরকার ও তাঁর পরিবার। পরিবারের ৬ সদস্যের মধ্যে সুশান্ত কুমার নিজে এবং তাঁর দুই সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী। হাত ও পায়ের জটিলতার কারণে স্বাভাবিক কাজ করার শক্তি নেই সুশান্তের।

প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর হোসেনের সহায়তায় সুশান্ত পার্শ্ববর্তী চিলমারী উপজেলার একটি রুটি কারখানায় কাজের সুযোগ পান। শারীরিক অক্ষমতার কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তিনি পুরোপুরি কাজ করতে পারেন না। তবুও পারিবারিক দুরবস্থা দেখে সহকর্মীদের অনুরোধে মালিক তাঁকে সামান্য বেতনে রেখেছেন। কিন্তু সেই সামান্য আয়ে তাঁর নিজের যাতায়াত ও খরচই মেটে না। ফলে সংসার চালাতে সুশান্তের স্ত্রী শিখা রানীকে অন্যের বাড়িতে ফরমায়েশ খেটে একসের-আধসের চালের সংস্থান করতে হয়।

এমন চরম সংকটে সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয় সুশান্তের ৮ বছর বয়সী বড় ছেলে হৃদয় চন্দ্র সরকার। পরিবারের অভাব মিটাতে সে এখন উলিপুর শহরের একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে শিশু শ্রমিকের কাজ করছে। সারাদিন গ্যারেজে হারভাঙা খাটুনির পর সে যে সামান্য টাকা আয় করে, তা-ই এখন এই ৬ জনের পরিবারের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। তবে বেশিরভাগ দিনই তাদের ভাগ্যে জোটেনা পেটপুরে একবেলা খাবার; কখনো খেয়ে, আবার কখনো না খেয়েই কাটছে জীবন।

শিশুমনে হাজারও কষ্টের গল্প চেপে রাখা হৃদয় জানায়:

"আমার পরিবার চলবার জন্যই আমি এই দোকানে কাজ করছি। আমার বাবা পঙ্গু, আমার ভাইও পঙ্গু; তাই বাধ্য হয়ে পরিবারের জন্য এই কাজ করতে হচ্ছে।"

গ্যারেজ মালিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, "ছেলেটার পরিবার অনেক গরিব, বাবা প্রতিবন্ধী। পরিবারের ভাইবোনদের মধ্যে সে-ই বড়। আমার এখানে কাজ করে প্রতিদিন যে দু-চার পয়সা আয় করে, তা দিয়েই কোনোমতে তাদের সংসার চলে।"

অশ্রুসিক্ত চোখে হৃদয়ের বাবা সুশান্ত কুমার সরকার আক্ষেপ করে বলেন, "আর ১০টা মানুষ যে কাজ করতে পারে, আমি পঙ্গু হওয়ায় তা পারি না। চারটি সন্তানের মধ্যে দুটিও পঙ্গু হয়ে জন্মেছে। বাধ্য হয়ে ৮ বছরের শিশু ছেলেটাকে গ্যারেজে কাজে দিতে হয়েছে।"

হৃদয়ের মা শিখা রানী বলেন, "সংসারে অভাব লেগেই আছে। যা পাই, অনেক সময় নিজে না খেয়ে সন্তানদের মুখে তুলে দিই। সন্তানেরা কখনো ভালোমন্দ খেতে চাইলে দিতে পারি না, তখন বুকটা ফেটে যায়। সৃষ্টিকর্তা দুর্ভোগ দিয়েছেন ভেবেই মনকে সান্ত্বনা দিই।"

স্থানীয় প্রতিবেশী অরবিন্দ রায় জানান, এটি অত্যন্ত দুস্থ একটি পরিবার। আশপাশের প্রতিবেশীরাও অভাবী হওয়ায় বড় কোনো সাহায্য করতে পারছেন না। বিত্তবানরা এগিয়ে এলে পরিবারটি অন্তত ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারত।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গুনাইগাছ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) সোলাইমান আলী বলেন:

"পরিবারের মধ্যে ৩ জনই প্রতিবন্ধী। সত্যি বলতে ৮ বছরের ওই বাচ্চাটিই এখন পুরো সংসারটা টানছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হয়। তবে দেশের কোনো বিত্তবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি এই পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, তবেই পরিবারটি স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারবে।"


জুফাস নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশক: খাদেমুল বাশার রিফাত


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জুফাস নিউজ