সকাল সাড়ে দশটা। গাইবান্ধা শহরের যক্ষারোগ চিকিৎসাগার তথা বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের বারান্দায় চুপচাপ বসে আছেন আশি বছর বয়সি আমিনা বেগম। বুকের কফজনিত সমস্যা নিয়ে সদর উপজেলার পূর্বপাড়া থেকে এসেছেন তিনি। পরীক্ষার জন্য কফের নমুনা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ফল যদি পজিটিভ আসে, তখন কার কাছে যাবেন— এই দুশ্চিন্তায় অস্থির তিনি। কারণ, ক্লিনিকে নেই কোনো যক্ষারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। শুধু আমিনা বেগম নন, প্রতিদিন এমন অনিশ্চয়তা আর হতাশা নিয়েই ফিরতে হচ্ছে গাইবান্ধার একমাত্র এই বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে আসা ২০ থেকে ৩০ জন রোগীকে।
জেলার একমাত্র এই বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি দেড় যুগ ধরেই ভুগছে জনবল সংকটে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসকশূন্যতা, ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকা আর কর্মীদের বেতন আটকে থাকার মতো একের পর এক জটিলতা। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির এই বেহাল চিত্র।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, যক্ষারোগ চিকিৎসাগারে (বক্ষব্যাধি ক্লিনিক) অনুমোদিত পদ মোট ১৭টি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন— প্রায় অর্ধেক পদই বছরের পর বছর ধরে শূন্য। ২০২২ সাল থেকে খালি পড়ে আছে মেডিকেল অফিসারের পদটি। চলতি বছরের ১৯ জুলাই থেকে শূন্য হয়েছে জুনিয়র কনসালট্যান্টের পদও। ফলে বর্তমানে ক্লিনিকে দায়িত্ব পালনের মতো কোনো চিকিৎসকই নেই।
চিকিৎসক-সংকট ছাড়াও গত ১৬ বছর ধরে এখানে নেই অফিস সহকারী, সহকারী নার্স ও গৃহপরিদর্শিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের জনবল। নেই কোনো পরিচ্ছন্নকর্মীও। এই দীর্ঘমেয়াদি জনবল সংকটে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম।
ক্লিনিকের কর্মচারীরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী এখানে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, একজন মেডিকেল অফিসার ও দুজন সহকারী নার্স থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে একজনও নেই। ফলে রোগীদের ওষুধ লিখবে কে— এটিই এখন মূল প্রশ্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন করে কোনো ওষুধ বরাদ্দ বা সংগ্রহ না হওয়ায় গত প্রায় দুই মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ।
শুধু ওষুধ নয়, প্রয়োজনীয় ফিল্মের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে এক্সরে মেশিনও। বর্তমানে কফ পরীক্ষা ছাড়া প্যাথলজির আর কোনো পরীক্ষাই সম্ভব হচ্ছে না এই ক্লিনিকে।
সম্প্রতি এক সকালে সরেজমিনে ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায় রোগীদের ভোগান্তির চিত্র। কর্মচারীরা দাফতরিক ব্যস্ত থাকলেও অনেকে আবার অলস সময় কাটাচ্ছেন গল্পগুজবে। বাইরে থেকে একের পর এক রোগী আসছেন, কিন্তু চিকিৎসকের দেখা মিলছে না। শেষমেষ সেবা না পেয়েই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে দেখা যায় অনেককে।
ফুলছড়ি গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ মিয়া বলেন, পর পার দুই দিন ডাক্তার দেখাতে আসছি। কিন্তু কোনো ডাক্তারের দেখা পেলাম না। দুজন ডাক্তার থাকার কথা, অথচ একজনও নেই। ডাক্তার থাকলে আমাদের এই সমস্যা হতো না। দ্রুত একজন যক্ষারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
গাইবান্ধা পৌর শহরের সুন্দরজাহান মোড়ের বাসিন্দা আনোয়ার মিয়া জানান, আগে এই ক্লিনিক থেকে ওষুধ পাওয়া যেত। কিন্তু প্রায় দুই মাস ধরে ওষুধ পাচ্ছেন না তিনি। গাইবান্ধা সদরের দক্ষিণ ধানঘড়া গ্রামের বাকী মিয়া বলেন, রোগ হলেই আসতাম, ওষুধ খেলে সারতো। এখন এসে শুধু ঘুরেই যাই। ডাক্তারও নেই, ওষুধও নেই। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান পলাশবাড়ীর ঘোড়াবান্ধা এলাকার রফিক মিয়াও। তিনি বলেন, আগে চিকিৎসার জন্য এই ক্লিনিকেই আসতেন, কিন্তু এখন যেদিনই যান, কর্মচারী ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায় না।
চিকিৎসক-সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে ক্লিনিকে কর্মরতদের বেতনও। বিষয়টি জানিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দফতরে দুই দফা চিঠি পাঠানো হলেও মেলেনি কোনো সমাধান।
জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির-সনাক সভাপতি আফরোজা বেগম বলেন, পুরোনো জরাজীর্ণ ভবনেই চলছে চিকিৎসাসেবা, অথচ ক্রমশ বাড়ছে জনসংখ্যা। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অন্তত একজন যক্ষারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, একজন মেডিকেল অফিসার, কয়েকজন নার্স ও পরিচ্ছন্নকর্মীসহ পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি নতুন ও আধুনিক ভবন নির্মাণের ওপর জোর দেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামান বলেন, ক্লিনিকের দায়িত্ব সামলাতে ইতোমধ্যে একজনকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনিক কিছু কাজ এখনো আটকে আছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া বা সিদ্ধান্ত আসেনি বলে জানান তিনি।
দেড় যুগের এই সংকট কাটিয়ে কবে স্বাভাবিক হবে গাইবান্ধার একমাত্র বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবা, আর কবেই বা সাধারণ মানুষ ফিরে পাবেন এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করার মতো আস্থা— তার সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই কারও কাছেই।
বিষয় : গাইবান্ধা

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সকাল সাড়ে দশটা। গাইবান্ধা শহরের যক্ষারোগ চিকিৎসাগার তথা বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের বারান্দায় চুপচাপ বসে আছেন আশি বছর বয়সি আমিনা বেগম। বুকের কফজনিত সমস্যা নিয়ে সদর উপজেলার পূর্বপাড়া থেকে এসেছেন তিনি। পরীক্ষার জন্য কফের নমুনা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ফল যদি পজিটিভ আসে, তখন কার কাছে যাবেন— এই দুশ্চিন্তায় অস্থির তিনি। কারণ, ক্লিনিকে নেই কোনো যক্ষারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। শুধু আমিনা বেগম নন, প্রতিদিন এমন অনিশ্চয়তা আর হতাশা নিয়েই ফিরতে হচ্ছে গাইবান্ধার একমাত্র এই বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে আসা ২০ থেকে ৩০ জন রোগীকে।
জেলার একমাত্র এই বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি দেড় যুগ ধরেই ভুগছে জনবল সংকটে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসকশূন্যতা, ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকা আর কর্মীদের বেতন আটকে থাকার মতো একের পর এক জটিলতা। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির এই বেহাল চিত্র।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, যক্ষারোগ চিকিৎসাগারে (বক্ষব্যাধি ক্লিনিক) অনুমোদিত পদ মোট ১৭টি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন— প্রায় অর্ধেক পদই বছরের পর বছর ধরে শূন্য। ২০২২ সাল থেকে খালি পড়ে আছে মেডিকেল অফিসারের পদটি। চলতি বছরের ১৯ জুলাই থেকে শূন্য হয়েছে জুনিয়র কনসালট্যান্টের পদও। ফলে বর্তমানে ক্লিনিকে দায়িত্ব পালনের মতো কোনো চিকিৎসকই নেই।
চিকিৎসক-সংকট ছাড়াও গত ১৬ বছর ধরে এখানে নেই অফিস সহকারী, সহকারী নার্স ও গৃহপরিদর্শিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের জনবল। নেই কোনো পরিচ্ছন্নকর্মীও। এই দীর্ঘমেয়াদি জনবল সংকটে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম।
ক্লিনিকের কর্মচারীরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী এখানে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, একজন মেডিকেল অফিসার ও দুজন সহকারী নার্স থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে একজনও নেই। ফলে রোগীদের ওষুধ লিখবে কে— এটিই এখন মূল প্রশ্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন করে কোনো ওষুধ বরাদ্দ বা সংগ্রহ না হওয়ায় গত প্রায় দুই মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ।
শুধু ওষুধ নয়, প্রয়োজনীয় ফিল্মের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে এক্সরে মেশিনও। বর্তমানে কফ পরীক্ষা ছাড়া প্যাথলজির আর কোনো পরীক্ষাই সম্ভব হচ্ছে না এই ক্লিনিকে।
সম্প্রতি এক সকালে সরেজমিনে ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায় রোগীদের ভোগান্তির চিত্র। কর্মচারীরা দাফতরিক ব্যস্ত থাকলেও অনেকে আবার অলস সময় কাটাচ্ছেন গল্পগুজবে। বাইরে থেকে একের পর এক রোগী আসছেন, কিন্তু চিকিৎসকের দেখা মিলছে না। শেষমেষ সেবা না পেয়েই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে দেখা যায় অনেককে।
ফুলছড়ি গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ মিয়া বলেন, পর পার দুই দিন ডাক্তার দেখাতে আসছি। কিন্তু কোনো ডাক্তারের দেখা পেলাম না। দুজন ডাক্তার থাকার কথা, অথচ একজনও নেই। ডাক্তার থাকলে আমাদের এই সমস্যা হতো না। দ্রুত একজন যক্ষারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
গাইবান্ধা পৌর শহরের সুন্দরজাহান মোড়ের বাসিন্দা আনোয়ার মিয়া জানান, আগে এই ক্লিনিক থেকে ওষুধ পাওয়া যেত। কিন্তু প্রায় দুই মাস ধরে ওষুধ পাচ্ছেন না তিনি। গাইবান্ধা সদরের দক্ষিণ ধানঘড়া গ্রামের বাকী মিয়া বলেন, রোগ হলেই আসতাম, ওষুধ খেলে সারতো। এখন এসে শুধু ঘুরেই যাই। ডাক্তারও নেই, ওষুধও নেই। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান পলাশবাড়ীর ঘোড়াবান্ধা এলাকার রফিক মিয়াও। তিনি বলেন, আগে চিকিৎসার জন্য এই ক্লিনিকেই আসতেন, কিন্তু এখন যেদিনই যান, কর্মচারী ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায় না।
চিকিৎসক-সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে ক্লিনিকে কর্মরতদের বেতনও। বিষয়টি জানিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দফতরে দুই দফা চিঠি পাঠানো হলেও মেলেনি কোনো সমাধান।
জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির-সনাক সভাপতি আফরোজা বেগম বলেন, পুরোনো জরাজীর্ণ ভবনেই চলছে চিকিৎসাসেবা, অথচ ক্রমশ বাড়ছে জনসংখ্যা। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অন্তত একজন যক্ষারোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, একজন মেডিকেল অফিসার, কয়েকজন নার্স ও পরিচ্ছন্নকর্মীসহ পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি নতুন ও আধুনিক ভবন নির্মাণের ওপর জোর দেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামান বলেন, ক্লিনিকের দায়িত্ব সামলাতে ইতোমধ্যে একজনকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনিক কিছু কাজ এখনো আটকে আছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া বা সিদ্ধান্ত আসেনি বলে জানান তিনি।
দেড় যুগের এই সংকট কাটিয়ে কবে স্বাভাবিক হবে গাইবান্ধার একমাত্র বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবা, আর কবেই বা সাধারণ মানুষ ফিরে পাবেন এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করার মতো আস্থা— তার সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই কারও কাছেই।

আপনার মতামত লিখুন