বয়সের ভারে শরীরের চামড়ায় স্পষ্ট বয়সের ছাপ, চুল-দাড়িতে ধরেছে পাক। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতার কাছে হার মানেননি ৬৫ বছরের বৃদ্ধ মজিবর রহমান। পেটের দায়ে কিংবা কারো দয়ার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের ঘামে অর্জিত উপার্জকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের কিশোরপুর গ্রামের এই মানুষটি গত ২০ বছর ধরে প্রতিদিন কলার মোচা ও টাটকা শাকসবজি বিক্রি করে অত্যন্ত সততার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন তার চার সদস্যের সংসার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নিজে ঘুরে ঘুরে বা সংগ্রহ করে টাটকা কলার মোচা ও বিভিন্ন শাকসবজি জোগাড় করেন মজিবর রহমান। এরপর বিকেল হলেই তা কাঁধে বা ভ্যানে করে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন উলিপুর, থেতরাই ও বাকরের বিভিন্ন হাট-বাজারে। এলাকায় তার সংগ্রহ করা কলার মোচার বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে মান ও সাইজভেদে প্রতি পিস বিচি কলার মোচা তিনি বিক্রি করছেন ৫০ থেকে ১০০ টাকা দরে। তবে শুধু পণ্যের মান নয়, বরং তাঁর অসাধারণ সততা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সদাচরণের কারণে মানুষ তার কাছ থেকেই কেনাকাটা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
মজিবর রহমানের দীর্ঘ এই জীবনপথ সহজ ছিল না। জীবনের বহু ঝড়-ঝাপ্টা বয়ে গেছে তাঁর ওপর দিয়ে। একে একে অকালে হারিয়েছেন নিজের দুই কলিজার টুকরো ছেলেকে। এরপরও থেমে থাকেনি তাঁর নিয়তির পরীক্ষা। একমাত্র মেয়ে মহসিনা বেগমের বিয়ে হয়েছিল থেতরাইয়ে। কিছুদিন পর সেই সংসার ভেঙে গেলে কোলজুড়ে থাকা শিশুকন্যা জান্নাতিকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন মহসিনা। সেই ভাঙা সংসারে নাতনি জান্নাতিকে নিজের কাছেই আশ্রয় দেন বৃদ্ধ মজিবর। পরবর্তীতে মেয়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয় দিনাজপুরে। সেখানেও জন্ম নেয় আরেকটি কন্যা শিশু, যার নাম কুলসুম। একটু বড় হওয়ার পর সেই নাতনি কুলসুমকেও নিজের কাছে নিয়ে আসেন তিনি।
বর্তমানে স্ত্রী সহিদা বেগম (৫৫) এবং দুই নাতনি জান্নাতি ও কুলসুমকে নিয়ে মজিবর রহমানের চার সদস্যের ছোট্ট সংসার। মাত্র পাঁচ শতাংশ বাড়ির ভিটা ছাড়া তাঁর আর একবিন্দুও আবাদি জমি নেই। বয়সের এই পড়ন্ত বেলায় এই চারজনের মুখের আহার জোগানোর পুরো যুদ্ধটাই চলছে তাঁর কলার মোচা বিক্রির সামান্য আয়ে। হাজারো অভাব অনটন আর বুকচাপা কষ্ট থাকলেও তিনি কখনো কারো কাছে হাত পাতেননি, পরমুখাপেক্ষী হননি। নিজের শ্রম ও আত্মমর্যাদাকেই একমাত্র পুঁজি করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
দৃঢ়চিত্তের এই মানুষটি বলেন, পরিশ্রম করলে আল্লাহ রিজিক চালান, কারো কাছে হাত পাততে হয় না। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, এই সৎ পথেই কাজ করে খাব। কারো বোঝা হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।
থেতরাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, মজিবর রহমান আমাদের এলাকার অত্যন্ত সৎ, পরিশ্রমী ও আত্মমর্যাদাশীল একজন মানুষ। এই বয়সেও কারো কাছে হাত না পেতে নিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে জীবিকা নির্বাহ করা সত্যিই বিরল ও প্রশংসনীয়। পাঁচ শতাংশ ভিটা ছাড়া আর সম্বল না থাকার পরও দুই নাতনিকে নিয়ে তাঁর এই আপসহীন লড়াই আমাদের সবার জন্য, বিশেষ করে আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।
বিষয় : কুড়িগ্রাম খবর উলিপুর

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
বয়সের ভারে শরীরের চামড়ায় স্পষ্ট বয়সের ছাপ, চুল-দাড়িতে ধরেছে পাক। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতার কাছে হার মানেননি ৬৫ বছরের বৃদ্ধ মজিবর রহমান। পেটের দায়ে কিংবা কারো দয়ার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের ঘামে অর্জিত উপার্জকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের কিশোরপুর গ্রামের এই মানুষটি গত ২০ বছর ধরে প্রতিদিন কলার মোচা ও টাটকা শাকসবজি বিক্রি করে অত্যন্ত সততার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন তার চার সদস্যের সংসার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নিজে ঘুরে ঘুরে বা সংগ্রহ করে টাটকা কলার মোচা ও বিভিন্ন শাকসবজি জোগাড় করেন মজিবর রহমান। এরপর বিকেল হলেই তা কাঁধে বা ভ্যানে করে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন উলিপুর, থেতরাই ও বাকরের বিভিন্ন হাট-বাজারে। এলাকায় তার সংগ্রহ করা কলার মোচার বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে মান ও সাইজভেদে প্রতি পিস বিচি কলার মোচা তিনি বিক্রি করছেন ৫০ থেকে ১০০ টাকা দরে। তবে শুধু পণ্যের মান নয়, বরং তাঁর অসাধারণ সততা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সদাচরণের কারণে মানুষ তার কাছ থেকেই কেনাকাটা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
মজিবর রহমানের দীর্ঘ এই জীবনপথ সহজ ছিল না। জীবনের বহু ঝড়-ঝাপ্টা বয়ে গেছে তাঁর ওপর দিয়ে। একে একে অকালে হারিয়েছেন নিজের দুই কলিজার টুকরো ছেলেকে। এরপরও থেমে থাকেনি তাঁর নিয়তির পরীক্ষা। একমাত্র মেয়ে মহসিনা বেগমের বিয়ে হয়েছিল থেতরাইয়ে। কিছুদিন পর সেই সংসার ভেঙে গেলে কোলজুড়ে থাকা শিশুকন্যা জান্নাতিকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন মহসিনা। সেই ভাঙা সংসারে নাতনি জান্নাতিকে নিজের কাছেই আশ্রয় দেন বৃদ্ধ মজিবর। পরবর্তীতে মেয়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয় দিনাজপুরে। সেখানেও জন্ম নেয় আরেকটি কন্যা শিশু, যার নাম কুলসুম। একটু বড় হওয়ার পর সেই নাতনি কুলসুমকেও নিজের কাছে নিয়ে আসেন তিনি।
বর্তমানে স্ত্রী সহিদা বেগম (৫৫) এবং দুই নাতনি জান্নাতি ও কুলসুমকে নিয়ে মজিবর রহমানের চার সদস্যের ছোট্ট সংসার। মাত্র পাঁচ শতাংশ বাড়ির ভিটা ছাড়া তাঁর আর একবিন্দুও আবাদি জমি নেই। বয়সের এই পড়ন্ত বেলায় এই চারজনের মুখের আহার জোগানোর পুরো যুদ্ধটাই চলছে তাঁর কলার মোচা বিক্রির সামান্য আয়ে। হাজারো অভাব অনটন আর বুকচাপা কষ্ট থাকলেও তিনি কখনো কারো কাছে হাত পাতেননি, পরমুখাপেক্ষী হননি। নিজের শ্রম ও আত্মমর্যাদাকেই একমাত্র পুঁজি করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
দৃঢ়চিত্তের এই মানুষটি বলেন, পরিশ্রম করলে আল্লাহ রিজিক চালান, কারো কাছে হাত পাততে হয় না। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, এই সৎ পথেই কাজ করে খাব। কারো বোঝা হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।
থেতরাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, মজিবর রহমান আমাদের এলাকার অত্যন্ত সৎ, পরিশ্রমী ও আত্মমর্যাদাশীল একজন মানুষ। এই বয়সেও কারো কাছে হাত না পেতে নিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে জীবিকা নির্বাহ করা সত্যিই বিরল ও প্রশংসনীয়। পাঁচ শতাংশ ভিটা ছাড়া আর সম্বল না থাকার পরও দুই নাতনিকে নিয়ে তাঁর এই আপসহীন লড়াই আমাদের সবার জন্য, বিশেষ করে আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

আপনার মতামত লিখুন