নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় সরকারি বিধিমালা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে রাস্তায় লাগানো সামাজিক বনায়নের মূল্যবান গাছ কর্তন ও আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খোদ উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. জোবায়ের আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রদীপ কুমার রায়কে ব্যবহার করে উপজেলার বিভিন্ন স্থানের সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে আত্মসাৎ করে আসছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫-২০-২৬ অর্থবছরে জলঢাকা উপজেলার কৈমারী-দোলাপাড়া এলাকায় ২ হাজার ১০০ মিটার সড়ক উন্নয়ন কাজের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে ২ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৭৩৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১২ মে ২০২৬ থেকে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়নের কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করায় ওই সড়কের পাশে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রোপণ করা বেশ কয়েকটি বৃহদাকৃতির ইউক্যালিপটাস গাছ অপসারণের প্রয়োজন দেখা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বনায়ন কর্মসূচির সদস্যদের অভিযোগ, সরকারি বিধি অনুযায়ী বনায়নের যেকোনো গাছ কাটার আগে নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়ন ও উন্মুক্ত নিলাম বা টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বন বিভাগ কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সহযোগী প্রদীপ কুমার রায়ের মাধ্যমে গাছগুলো তড়িঘড়ি করে কেটে ফেলে এবং পরে সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে গোপনে বিক্রির পাঁয়তারা করে।
সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির স্থানীয় সদস্য ধীরেন্দ্র অধিকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন:
“আমরা এই বাগানের নিবন্ধিত সদস্য। কিন্তু গাছ নিলাম বা কর্তনের বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। প্রদীপ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবেই সরকারি গাছ কাটা হয়েছে। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনায়নের আরেক সদস্য এই সিন্ডিকেটের ভয়ংকর রূপ তুলে ধরে বলেন, “এই লুটপাটের বিষয়ে কিছু বলতে গেলে স্থানীয়ভাবে নানামুখী ভয়ভীতি ও মারধরের আশঙ্কা থাকে। তাদের ক্ষমতার দাপটে তাই কেউ মুখ খুলতে চায় না।”
এমনকি গাছ উপড়ে ফেলার কাজে ব্যবহৃত স্কাভেটর মেশিনের পরিচালকও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, প্রদীপ কুমার রায়ের নির্দেশেই তারা গাছগুলো কেটেছেন।
গাছ কাটার সাথে সরাসরি জড়িত অভিযুক্ত প্রদীপ কুমার রায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, “আমার কোনো দোষ নেই। জলঢাকা বন বিভাগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের আলম আমাকে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমি সে অনুযায়ী কাজ করেছি মাত্র।”
অন্যদিকে, জলঢাকা উপজেলা প্রকৌশলী মো. তারিকুজ্জামান বলেন, “সড়ক উন্নয়নের স্বার্থে গাছগুলো অপসারণের জন্য আমরা অনেক আগেই বন বিভাগকে লিখিত চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে এভাবে পরস্পর যোগসাজশে গাছ কাটলে আমাদের কিছু করার নেই।”
এই গুরুতর অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. জোবায়ের আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে কোনো মন্তব্য না করেই তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করেন।
সরকারি সম্পদ এভাবে হরিলুটের ঘটনাটি জলঢাকা এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে নীলফামারী জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা শাহিকুল ইসলাম বলেন, “জলঢাকায় সামাজিক বনায়নের গাছ নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাটা ও সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল এই গাছ কর্তন ও বিক্রির দুর্নীতির পেছনে থাকা সরকারি কর্মকর্তা ও তাঁর সহযোগীর বিরুদ্ধে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
বিষয় : জলঢাকার খবর

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় সরকারি বিধিমালা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে রাস্তায় লাগানো সামাজিক বনায়নের মূল্যবান গাছ কর্তন ও আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খোদ উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. জোবায়ের আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রদীপ কুমার রায়কে ব্যবহার করে উপজেলার বিভিন্ন স্থানের সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে আত্মসাৎ করে আসছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫-২০-২৬ অর্থবছরে জলঢাকা উপজেলার কৈমারী-দোলাপাড়া এলাকায় ২ হাজার ১০০ মিটার সড়ক উন্নয়ন কাজের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে ২ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৭৩৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১২ মে ২০২৬ থেকে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়নের কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করায় ওই সড়কের পাশে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রোপণ করা বেশ কয়েকটি বৃহদাকৃতির ইউক্যালিপটাস গাছ অপসারণের প্রয়োজন দেখা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বনায়ন কর্মসূচির সদস্যদের অভিযোগ, সরকারি বিধি অনুযায়ী বনায়নের যেকোনো গাছ কাটার আগে নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়ন ও উন্মুক্ত নিলাম বা টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বন বিভাগ কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সহযোগী প্রদীপ কুমার রায়ের মাধ্যমে গাছগুলো তড়িঘড়ি করে কেটে ফেলে এবং পরে সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে গোপনে বিক্রির পাঁয়তারা করে।
সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির স্থানীয় সদস্য ধীরেন্দ্র অধিকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন:
“আমরা এই বাগানের নিবন্ধিত সদস্য। কিন্তু গাছ নিলাম বা কর্তনের বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। প্রদীপ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবেই সরকারি গাছ কাটা হয়েছে। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনায়নের আরেক সদস্য এই সিন্ডিকেটের ভয়ংকর রূপ তুলে ধরে বলেন, “এই লুটপাটের বিষয়ে কিছু বলতে গেলে স্থানীয়ভাবে নানামুখী ভয়ভীতি ও মারধরের আশঙ্কা থাকে। তাদের ক্ষমতার দাপটে তাই কেউ মুখ খুলতে চায় না।”
এমনকি গাছ উপড়ে ফেলার কাজে ব্যবহৃত স্কাভেটর মেশিনের পরিচালকও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, প্রদীপ কুমার রায়ের নির্দেশেই তারা গাছগুলো কেটেছেন।
গাছ কাটার সাথে সরাসরি জড়িত অভিযুক্ত প্রদীপ কুমার রায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, “আমার কোনো দোষ নেই। জলঢাকা বন বিভাগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের আলম আমাকে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমি সে অনুযায়ী কাজ করেছি মাত্র।”
অন্যদিকে, জলঢাকা উপজেলা প্রকৌশলী মো. তারিকুজ্জামান বলেন, “সড়ক উন্নয়নের স্বার্থে গাছগুলো অপসারণের জন্য আমরা অনেক আগেই বন বিভাগকে লিখিত চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে এভাবে পরস্পর যোগসাজশে গাছ কাটলে আমাদের কিছু করার নেই।”
এই গুরুতর অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. জোবায়ের আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে কোনো মন্তব্য না করেই তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করেন।
সরকারি সম্পদ এভাবে হরিলুটের ঘটনাটি জলঢাকা এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে নীলফামারী জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা শাহিকুল ইসলাম বলেন, “জলঢাকায় সামাজিক বনায়নের গাছ নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাটা ও সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল এই গাছ কর্তন ও বিক্রির দুর্নীতির পেছনে থাকা সরকারি কর্মকর্তা ও তাঁর সহযোগীর বিরুদ্ধে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন