রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, নীলফামারী ও রংপুর জেলার কৃষি অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে তিস্তা সেচ ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণের এক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পদে পদে মারাত্মক অনিয়ম, কারিগরি ত্রুটি আর নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারে অতিষ্ঠ খোদ সুবিধাভোগী কৃষকরা। প্রকল্পের নামে খালের দুই ধারের প্রায় ৪ লাখ পরিণত গাছ কেটে সাবাড় এবং কৃষিজমির ‘টপসয়েল’ (উর্বর উপরিভাগের মাটি) চুরির কারণে উত্তরবঙ্গের পরিবেশ ও কৃষি এখন চরম হুমকির মুখে।
বিশাল বাজেটের এই মেগা প্রকল্পের প্রকৃত সুফল যেন প্রান্তিক চাষির দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেজন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
২০২১ সালে তিস্তা সেচ ক্যানেলের ‘কমান্ড এলাকা’ সংস্কার ও সম্প্রসারণের এই মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় এবং ২০২২ সালের এপ্রিলে এর চূড়ান্ত রূপরেখা অনুমোদিত হয়। ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় পাউবো।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, তিস্তা ব্যারেজ থেকে শুরু হয়ে নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুর ও সদর; রংপুরের গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ এবং দিনাজপুরের খানসামা ও চিরিরবন্দর মিলিয়ে মোট ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সেচ খালের পাড় শক্তিশালীকরণ করার কথা। এর মধ্যে রয়েছে:
৭২ কিলোমিটারে ভূগর্ভস্থ সেচ পাইপ স্থাপন।
পাড় রক্ষায় ১০ দশমিক ০৮ কিলোমিটারে কংক্রিটের সিসি ব্লক বসানো।
৭ দশমিক ১৩ কিলোমিটার বাইপাস সেচখাল ও ২৭টি কালভার্ট নির্মাণ।
২৭০ হেক্টরে জলাধার পুনঃখনন ও ৯.৫ কিলোমিটার নালা পুনঃখনন।
৫২ কিলোমিটার পরিদর্শন রাস্তা মেরামত ও ২০টি রেগুলেটর নির্মাণ।
পরিবেশ সুরক্ষায় ৮৭ হাজারের বেশি নতুন গাছ রোপণ।
কাগজে-কলমে বিশাল এই কর্মযজ্ঞের কথা বলা হলেও বাস্তবে ক্যানেলগুলো এখন পানিশূন্য। সরেজমিনে নীলফামারী ও রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা বাধ্য হয়ে নিজস্ব অর্থায়নে ক্যানেলের ধারে গভীর নলকূপ ও ব্যক্তিগত সেচপাম্প বসিয়ে শুকনো তিস্তা সেচ নালায় পানি তুলছেন, যাতে সেই পানি ক্যানেলের মাধ্যমে দূরের ফসলি জমিতে পৌঁছানো যায়।
নীলফামারী সদরের সেচ ক্যানেল এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম, জয়নাল ও আলমগীর হোসেনসহ অন্তত ২০ জন চাষি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের এই প্রকল্প দিয়ে আমাদের কী লাভ হলো, যদি নিজেদের টাকাই খরচ করতে হয়? বছরের পর বছর এসব নালায় পানি আসে না।”
জলঢাকা ও ডিমলা এলাকার কৃষকরা জানান, গত বছর খালের যে অংশে সিসি ঢালাই করা হয়েছিল, পানি আসার আগেই তা ধসে পড়েছে। এছাড়া মারাত্মক কারিগরি ও প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে বেশিরভাগ এলাকায় সংস্কার করা সেচখালের তলদেশ আশপাশের ফসলি জমির চেয়ে অনেক নিচু হয়ে গেছে। ফলে ক্যানেলে সামান্য পানি থাকলেও তা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমিতে উঠছে না। কিছু কিছু নালার কাঠামো এতটাই দুর্বল যে পানি ছাড়লে উপকারের চেয়ে উল্টো বাঁধ ভেঙে জমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪-এ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী, ক্যানেলের পাড় মজবুত ও টেকসই করার জন্য বাইরে থেকে ট্রাকে করে মাটি এনে ভরাট করার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ বাঁচাতে খালের তলদেশ এবং পাশের আবাদি জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কেটেই পাড় বাঁধানোর কাজ চালাচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ সেচ প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ ও আব্দুল মজিদসহ অন্তত ১০ জন অভিযোগ করেন, ঠিকাদারের লোকজন খরচ বাঁচাতে পাশের আবাদি জমি ও নালার তলদেশের মাটি কেটে ক্যানেলের পাড়ে দিচ্ছে। এতে একদিকে আবাদি জমি চিরতরে উর্বরতা হারাচ্ছে, অন্যদিকে ক্যানেলের বাঁধগুলো নরম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সামান্য পানির চাপেই ভেঙে পড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে তারা গ্রামবাসী মিলে ক্যানেল পাড়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু এর জেরে ঠিকাদার ও পাউবোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসে উল্টো গ্রামবাসীদের ওপর চড়াও হন এবং হামলার ঘটনা ঘটে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্যানেল টেকসই করতে যে সিসি ঢালাই ও কার্পেটিং করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী (বালু ও নামমাত্র সিমেন্ট) দিয়ে তৈরি করায় নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই তা ভেঙে ধসে পড়ছে।সবচেয়ে ভয়াবহ অনিয়ম মিলেছে ক্যানেলের তলদেশ ও পাড় রক্ষায়। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী ‘জিওব্যাগ’ ফেলার কথা, সেখানে ব্যয় কমিয়ে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ফেলা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের সাধারণ চটের বস্তা, যা অল্প দিনেই পচে ধসে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পাউবোর মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ও তদারকির অভাবেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই পুকুরচুরি করার সুযোগ পেয়েছে।
প্রকল্পের নথিপত্রে নতুন করে গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা দেখিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার কথা বলা হলেও, বাস্তবে এই সেচ ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণ করতে গিয়ে ক্যানেলের দুই ধারের প্রায় ৪ লাখ পরিণত ও অপরিণত ঐতিহ্যবাহী গাছ কেটে সাবাড় করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কয়েক দশক ধরে ক্যানেলের পাড় বাঁধিয়ে রাখা এসব গাছ কাটার ফলে পুরো উত্তরবঙ্গের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে, আলগা হয়ে গেছে দুই ধারের মাটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যানোপি বা ছায়া দেওয়া এই গাছগুলো কাটার ফলে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
ক্যানেলে পানি দিতে গিয়ে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারেজের ভাটির প্রবাহ সম্পূর্ণ আটকে দেওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের মোহনা পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার নদীপথ এখন পানিশূন্য মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে নদী ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ কঠোর সমালোচনা করে বলেন:
“প্রথম ধাপে ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও পানির অভাবে তা কখনোই পূরণ হয়নি। ২০১৪ সাল থেকে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পর এখন যে সামান্য পানি আসে, তা-ও আটকে দিয়ে ভাটির ৯০ কিলোমিটার নদীকে মরুভূমি বানানো হচ্ছে। নদী মেরে সেচ প্রকল্পের এই পরিধি বাড়ানো কোনোভাবেই পরিবেশবান্ধব বা বৈজ্ঞানিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যদি জাতিসংঘে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিকার চাই, তাহলে তারাও প্রশ্ন তুলবে বাংলাদেশ নিজের অংশের ১১৫ কিলোমিটার নদীকে কতটা বাঁচিয়ে রেখেছে? নদীকে মেরে দেড় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের সুফল ও আয়-ব্যয়ের হিসাব করা এখন সময়ের দাবি। খাল খননের নামে রাস্তাঘাট ও গাছ কেটে যে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে, তার কঠোর জবাবদিহিতা থাকা উচিত।”
অনিয়ম ও বৃক্ষনিধনের এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রথামুগতিক বক্তব্য মিলেছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী এবং সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান জানান, নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় কাজে অনিয়ম বা ত্রুটির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়দের ওপর হামলা বা ৪ লাখ গাছ কাটার ফলে পরিবেশগত ক্ষতির সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারেননি।
এদিকে ক্যানেল সংস্কারে খালের তলদেশ ও আবাদি জমির মাটি কাটা, সিসি ঢালাইয়ে নিম্নমানের সামগ্রী, জিও ব্যাগের পরিবর্তে চটের বস্তা ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জানতে পাউবোর রংপুর বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মোহা. সরফরাজ বান্দার মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও নদীকে বাঁচাতে এই দেড় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের প্রতিটি খাতের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত চান ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, নীলফামারী ও রংপুর জেলার কৃষি অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে তিস্তা সেচ ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণের এক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পদে পদে মারাত্মক অনিয়ম, কারিগরি ত্রুটি আর নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারে অতিষ্ঠ খোদ সুবিধাভোগী কৃষকরা। প্রকল্পের নামে খালের দুই ধারের প্রায় ৪ লাখ পরিণত গাছ কেটে সাবাড় এবং কৃষিজমির ‘টপসয়েল’ (উর্বর উপরিভাগের মাটি) চুরির কারণে উত্তরবঙ্গের পরিবেশ ও কৃষি এখন চরম হুমকির মুখে।
বিশাল বাজেটের এই মেগা প্রকল্পের প্রকৃত সুফল যেন প্রান্তিক চাষির দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেজন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
২০২১ সালে তিস্তা সেচ ক্যানেলের ‘কমান্ড এলাকা’ সংস্কার ও সম্প্রসারণের এই মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় এবং ২০২২ সালের এপ্রিলে এর চূড়ান্ত রূপরেখা অনুমোদিত হয়। ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় পাউবো।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, তিস্তা ব্যারেজ থেকে শুরু হয়ে নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুর ও সদর; রংপুরের গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ এবং দিনাজপুরের খানসামা ও চিরিরবন্দর মিলিয়ে মোট ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সেচ খালের পাড় শক্তিশালীকরণ করার কথা। এর মধ্যে রয়েছে:
৭২ কিলোমিটারে ভূগর্ভস্থ সেচ পাইপ স্থাপন।
পাড় রক্ষায় ১০ দশমিক ০৮ কিলোমিটারে কংক্রিটের সিসি ব্লক বসানো।
৭ দশমিক ১৩ কিলোমিটার বাইপাস সেচখাল ও ২৭টি কালভার্ট নির্মাণ।
২৭০ হেক্টরে জলাধার পুনঃখনন ও ৯.৫ কিলোমিটার নালা পুনঃখনন।
৫২ কিলোমিটার পরিদর্শন রাস্তা মেরামত ও ২০টি রেগুলেটর নির্মাণ।
পরিবেশ সুরক্ষায় ৮৭ হাজারের বেশি নতুন গাছ রোপণ।
কাগজে-কলমে বিশাল এই কর্মযজ্ঞের কথা বলা হলেও বাস্তবে ক্যানেলগুলো এখন পানিশূন্য। সরেজমিনে নীলফামারী ও রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা বাধ্য হয়ে নিজস্ব অর্থায়নে ক্যানেলের ধারে গভীর নলকূপ ও ব্যক্তিগত সেচপাম্প বসিয়ে শুকনো তিস্তা সেচ নালায় পানি তুলছেন, যাতে সেই পানি ক্যানেলের মাধ্যমে দূরের ফসলি জমিতে পৌঁছানো যায়।
নীলফামারী সদরের সেচ ক্যানেল এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম, জয়নাল ও আলমগীর হোসেনসহ অন্তত ২০ জন চাষি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের এই প্রকল্প দিয়ে আমাদের কী লাভ হলো, যদি নিজেদের টাকাই খরচ করতে হয়? বছরের পর বছর এসব নালায় পানি আসে না।”
জলঢাকা ও ডিমলা এলাকার কৃষকরা জানান, গত বছর খালের যে অংশে সিসি ঢালাই করা হয়েছিল, পানি আসার আগেই তা ধসে পড়েছে। এছাড়া মারাত্মক কারিগরি ও প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে বেশিরভাগ এলাকায় সংস্কার করা সেচখালের তলদেশ আশপাশের ফসলি জমির চেয়ে অনেক নিচু হয়ে গেছে। ফলে ক্যানেলে সামান্য পানি থাকলেও তা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমিতে উঠছে না। কিছু কিছু নালার কাঠামো এতটাই দুর্বল যে পানি ছাড়লে উপকারের চেয়ে উল্টো বাঁধ ভেঙে জমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪-এ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী, ক্যানেলের পাড় মজবুত ও টেকসই করার জন্য বাইরে থেকে ট্রাকে করে মাটি এনে ভরাট করার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ বাঁচাতে খালের তলদেশ এবং পাশের আবাদি জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কেটেই পাড় বাঁধানোর কাজ চালাচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ সেচ প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ ও আব্দুল মজিদসহ অন্তত ১০ জন অভিযোগ করেন, ঠিকাদারের লোকজন খরচ বাঁচাতে পাশের আবাদি জমি ও নালার তলদেশের মাটি কেটে ক্যানেলের পাড়ে দিচ্ছে। এতে একদিকে আবাদি জমি চিরতরে উর্বরতা হারাচ্ছে, অন্যদিকে ক্যানেলের বাঁধগুলো নরম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সামান্য পানির চাপেই ভেঙে পড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে তারা গ্রামবাসী মিলে ক্যানেল পাড়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু এর জেরে ঠিকাদার ও পাউবোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসে উল্টো গ্রামবাসীদের ওপর চড়াও হন এবং হামলার ঘটনা ঘটে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্যানেল টেকসই করতে যে সিসি ঢালাই ও কার্পেটিং করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী (বালু ও নামমাত্র সিমেন্ট) দিয়ে তৈরি করায় নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই তা ভেঙে ধসে পড়ছে।সবচেয়ে ভয়াবহ অনিয়ম মিলেছে ক্যানেলের তলদেশ ও পাড় রক্ষায়। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী ‘জিওব্যাগ’ ফেলার কথা, সেখানে ব্যয় কমিয়ে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ফেলা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের সাধারণ চটের বস্তা, যা অল্প দিনেই পচে ধসে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পাউবোর মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ও তদারকির অভাবেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই পুকুরচুরি করার সুযোগ পেয়েছে।
প্রকল্পের নথিপত্রে নতুন করে গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা দেখিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার কথা বলা হলেও, বাস্তবে এই সেচ ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণ করতে গিয়ে ক্যানেলের দুই ধারের প্রায় ৪ লাখ পরিণত ও অপরিণত ঐতিহ্যবাহী গাছ কেটে সাবাড় করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কয়েক দশক ধরে ক্যানেলের পাড় বাঁধিয়ে রাখা এসব গাছ কাটার ফলে পুরো উত্তরবঙ্গের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে, আলগা হয়ে গেছে দুই ধারের মাটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যানোপি বা ছায়া দেওয়া এই গাছগুলো কাটার ফলে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
ক্যানেলে পানি দিতে গিয়ে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারেজের ভাটির প্রবাহ সম্পূর্ণ আটকে দেওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের মোহনা পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার নদীপথ এখন পানিশূন্য মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে নদী ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ কঠোর সমালোচনা করে বলেন:
“প্রথম ধাপে ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও পানির অভাবে তা কখনোই পূরণ হয়নি। ২০১৪ সাল থেকে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পর এখন যে সামান্য পানি আসে, তা-ও আটকে দিয়ে ভাটির ৯০ কিলোমিটার নদীকে মরুভূমি বানানো হচ্ছে। নদী মেরে সেচ প্রকল্পের এই পরিধি বাড়ানো কোনোভাবেই পরিবেশবান্ধব বা বৈজ্ঞানিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যদি জাতিসংঘে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিকার চাই, তাহলে তারাও প্রশ্ন তুলবে বাংলাদেশ নিজের অংশের ১১৫ কিলোমিটার নদীকে কতটা বাঁচিয়ে রেখেছে? নদীকে মেরে দেড় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের সুফল ও আয়-ব্যয়ের হিসাব করা এখন সময়ের দাবি। খাল খননের নামে রাস্তাঘাট ও গাছ কেটে যে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে, তার কঠোর জবাবদিহিতা থাকা উচিত।”
অনিয়ম ও বৃক্ষনিধনের এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রথামুগতিক বক্তব্য মিলেছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী এবং সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান জানান, নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় কাজে অনিয়ম বা ত্রুটির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়দের ওপর হামলা বা ৪ লাখ গাছ কাটার ফলে পরিবেশগত ক্ষতির সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারেননি।
এদিকে ক্যানেল সংস্কারে খালের তলদেশ ও আবাদি জমির মাটি কাটা, সিসি ঢালাইয়ে নিম্নমানের সামগ্রী, জিও ব্যাগের পরিবর্তে চটের বস্তা ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জানতে পাউবোর রংপুর বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মোহা. সরফরাজ বান্দার মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও নদীকে বাঁচাতে এই দেড় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের প্রতিটি খাতের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত চান ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

আপনার মতামত লিখুন