বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদটির সম্পর্ক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন রাষ্ট্রপতির পথচলায় দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের নানা অধ্যায় জড়িয়ে আছে।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালে সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার অভ্যুত্থানে তিনি শহীদ হন।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৮১ সালের নির্বাচনে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফেরার পর সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি এর আগে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী এবং আবদুস সাত্তারের সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি হন দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ১৪ নভেম্বর তিনি শপথ নেন। তবে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলে ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তিনি বিকল্পধারা বাংলাদেশ নামে নতুন দল গঠন করেন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বিএনপির নেতা ছিলেন না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সংসদের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটে রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয়।
এরপর দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি পদে আসে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মেয়াদে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে দায়িত্বরত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
এরপর ২০ আগস্ট ২০২৬ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হন। সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি ২৫৫ ভোট পান। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি হওয়া থেকে শুরু করে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা শুধু বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও ক্ষমতার পালাবদলেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
বিষয় : বিএনপি রাষ্ট্রপতি

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদটির সম্পর্ক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন রাষ্ট্রপতির পথচলায় দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের নানা অধ্যায় জড়িয়ে আছে।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালে সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার অভ্যুত্থানে তিনি শহীদ হন।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৮১ সালের নির্বাচনে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফেরার পর সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি এর আগে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী এবং আবদুস সাত্তারের সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি হন দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ১৪ নভেম্বর তিনি শপথ নেন। তবে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলে ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তিনি বিকল্পধারা বাংলাদেশ নামে নতুন দল গঠন করেন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বিএনপির নেতা ছিলেন না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সংসদের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটে রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয়।
এরপর দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি পদে আসে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মেয়াদে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে দায়িত্বরত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
এরপর ২০ আগস্ট ২০২৬ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হন। সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি ২৫৫ ভোট পান। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি হওয়া থেকে শুরু করে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা শুধু বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও ক্ষমতার পালাবদলেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।

আপনার মতামত লিখুন