একদিকে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, দারিদ্র্যের দেয়াল ভেঙে উঠে আসার অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প; অন্যদিকে একটি চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ার নির্মম বাস্তবতা। অভাবের সংসারে বাবা-মায়ের রক্ত-ঘাম জল করা স্বপ্নের যে ফসল ঘরে ওঠার কথা ছিল, এক নিমেষেই তা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের ইতিহাস বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেও চূড়ান্ত সরকারি গেজেটে ঠাঁই পাননি অদম্য মেধাবী সোহেল রানা। এক চরম বঞ্চনার শিকার হয়ে আজ বুকচাপা কান্নায় দিন কাটছে সোহেল ও তার পরিবারের।
দারিদ্র্য জয় করে শীর্ষে ওঠার গল্প
সোহেল রানার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে নিদারুণ আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে। বাবা আবু হোসেন পেশায় একজন সাধারণ কৃষক। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পৈতৃক জমিতে ফসল ফলিয়ে সংসার চালানোই যেখানে ছিল চ্যালেঞ্জ, সেখানে ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো ছিল আকাশকুসুম কল্পনার মতো।
তবে বাবার সেই সামর্থ্যের অভাবকে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির আড়াল হতে দেননি সোহেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন টিউশনি করে। মেধার প্রমাণ রেখে ২০২০ সালে স্নাতকে ৩.৫৪ সিজিপিএ এবং ২০২১ সালে স্নাতকোত্তরে ৩.৫৬ সিজিপিএ অর্জন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেই থেমে থাকেননি; ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে অংশ নিয়ে ইতিহাস বিভাগে সারা দেশে প্রথম স্থান অর্জন করে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে।
যেখানে উল্লাস পরিণত হলো দীর্ঘশ্বাসে
বিসিএসের ফল প্রকাশের পর আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল সোহেলের পরিবারে। এক সাক্ষাৎকারে আবেগাপ্লুত সোহেল রানা বলেছিলেন, “আল্লাহর রহমতে আমি বিসিএস ক্যাডার হয়েছি। এটা আমার জন্য ভীষণ পাওয়া... আমি গরিব পরিবারের সন্তান, বাবা কৃষি কাজ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনি করে পড়াশোনা চালিয়েছি। সকলের দোয়ায় আজ আমি বিসিএস ক্যাডার হয়েছি।”
ছেলের এই অর্জনে কৃষক বাবা আবু হোসেনের চোখে ছিল স্বপ্নের দ্যুতি। গর্বভরে তিনি বলেছিলেন, “আমি একজন কৃষক মানুষ, আমার ছেলে বিসিএস অফিসার হয়েছে—এটা আমার জন্য স্বপ্নের মতো। আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ, তবুও কখনো ছেলেকে পড়ালেখা থামাতে বলিনি।” সোহেলের এমন অর্জনে উদ্বেলিত ছিলেন তার শিক্ষক মমিনুর রহমানও, যিনি ছোটবেলা থেকেই সোহেলের মেধা ও নিষ্ঠা দেখে তাকে নিয়ে বড় স্বপ্ন বুনেছিলেন।
কিন্তু সেই আনন্দের স্থায়িত্ব ছিল ক্ষণিকের। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দিন সব উল্লাস স্তব্ধ হয়ে যায়। পুরো বিসিএসে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত তালিকার কোথাও ছিল না সোহেল রানার নাম!
এক বঞ্চনায় থমকে যাওয়া একটি পরিবারের স্বপ্ন
একটি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পেছনে থাকে বছরের পর বছর পরিশ্রম, রাতজাগা সাধনা আর একটি পুরো পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সমস্ত যোগ্যতা প্রমাণ করার পরও শেষ ধাপে এসে এভাবে বাদ পড়া কেবল সোহেল রানার একার বঞ্চনা নয়; এটি একজন কৃষক বাবার আজীবনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর স্বপ্নের ওপর এক নির্মম আঘাত।
মেধাবী সোহেল রানার নাম চূড়ান্ত গেজেটে না থাকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবনে এমন বঞ্চনা শুধু একটি ক্যারিয়ার ধ্বংস করে না, বরং পুরো সমাজের কাছেই মেধার মূল্যায়ন নিয়ে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড়িয়ে করায়। সব বাধা পেরিয়ে প্রথম হওয়া সোহেল রানা কি পাবেন তার প্রাপ্য অধিকার, নাকি আমলাতান্ত্রিক কোনো জটিলতায় চাপা পড়ে থাকবে এই কৃষকপুত্রের অদম্য স্বপ্ন? উত্তরটা এখনো অনিশ্চিত, তবে সোহেলের পরিবারের চোখে এখন শুধুই জল আর এক বুক হতাশা।
বিষয় : নীলফামারীর খবর বিসিএস

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬
একদিকে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, দারিদ্র্যের দেয়াল ভেঙে উঠে আসার অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প; অন্যদিকে একটি চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ার নির্মম বাস্তবতা। অভাবের সংসারে বাবা-মায়ের রক্ত-ঘাম জল করা স্বপ্নের যে ফসল ঘরে ওঠার কথা ছিল, এক নিমেষেই তা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের ইতিহাস বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেও চূড়ান্ত সরকারি গেজেটে ঠাঁই পাননি অদম্য মেধাবী সোহেল রানা। এক চরম বঞ্চনার শিকার হয়ে আজ বুকচাপা কান্নায় দিন কাটছে সোহেল ও তার পরিবারের।
দারিদ্র্য জয় করে শীর্ষে ওঠার গল্প
সোহেল রানার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে নিদারুণ আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে। বাবা আবু হোসেন পেশায় একজন সাধারণ কৃষক। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পৈতৃক জমিতে ফসল ফলিয়ে সংসার চালানোই যেখানে ছিল চ্যালেঞ্জ, সেখানে ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো ছিল আকাশকুসুম কল্পনার মতো।
তবে বাবার সেই সামর্থ্যের অভাবকে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির আড়াল হতে দেননি সোহেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন টিউশনি করে। মেধার প্রমাণ রেখে ২০২০ সালে স্নাতকে ৩.৫৪ সিজিপিএ এবং ২০২১ সালে স্নাতকোত্তরে ৩.৫৬ সিজিপিএ অর্জন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেই থেমে থাকেননি; ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে অংশ নিয়ে ইতিহাস বিভাগে সারা দেশে প্রথম স্থান অর্জন করে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে।
যেখানে উল্লাস পরিণত হলো দীর্ঘশ্বাসে
বিসিএসের ফল প্রকাশের পর আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল সোহেলের পরিবারে। এক সাক্ষাৎকারে আবেগাপ্লুত সোহেল রানা বলেছিলেন, “আল্লাহর রহমতে আমি বিসিএস ক্যাডার হয়েছি। এটা আমার জন্য ভীষণ পাওয়া... আমি গরিব পরিবারের সন্তান, বাবা কৃষি কাজ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনি করে পড়াশোনা চালিয়েছি। সকলের দোয়ায় আজ আমি বিসিএস ক্যাডার হয়েছি।”
ছেলের এই অর্জনে কৃষক বাবা আবু হোসেনের চোখে ছিল স্বপ্নের দ্যুতি। গর্বভরে তিনি বলেছিলেন, “আমি একজন কৃষক মানুষ, আমার ছেলে বিসিএস অফিসার হয়েছে—এটা আমার জন্য স্বপ্নের মতো। আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ, তবুও কখনো ছেলেকে পড়ালেখা থামাতে বলিনি।” সোহেলের এমন অর্জনে উদ্বেলিত ছিলেন তার শিক্ষক মমিনুর রহমানও, যিনি ছোটবেলা থেকেই সোহেলের মেধা ও নিষ্ঠা দেখে তাকে নিয়ে বড় স্বপ্ন বুনেছিলেন।
কিন্তু সেই আনন্দের স্থায়িত্ব ছিল ক্ষণিকের। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দিন সব উল্লাস স্তব্ধ হয়ে যায়। পুরো বিসিএসে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত তালিকার কোথাও ছিল না সোহেল রানার নাম!
এক বঞ্চনায় থমকে যাওয়া একটি পরিবারের স্বপ্ন
একটি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পেছনে থাকে বছরের পর বছর পরিশ্রম, রাতজাগা সাধনা আর একটি পুরো পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সমস্ত যোগ্যতা প্রমাণ করার পরও শেষ ধাপে এসে এভাবে বাদ পড়া কেবল সোহেল রানার একার বঞ্চনা নয়; এটি একজন কৃষক বাবার আজীবনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর স্বপ্নের ওপর এক নির্মম আঘাত।
মেধাবী সোহেল রানার নাম চূড়ান্ত গেজেটে না থাকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবনে এমন বঞ্চনা শুধু একটি ক্যারিয়ার ধ্বংস করে না, বরং পুরো সমাজের কাছেই মেধার মূল্যায়ন নিয়ে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড়িয়ে করায়। সব বাধা পেরিয়ে প্রথম হওয়া সোহেল রানা কি পাবেন তার প্রাপ্য অধিকার, নাকি আমলাতান্ত্রিক কোনো জটিলতায় চাপা পড়ে থাকবে এই কৃষকপুত্রের অদম্য স্বপ্ন? উত্তরটা এখনো অনিশ্চিত, তবে সোহেলের পরিবারের চোখে এখন শুধুই জল আর এক বুক হতাশা।

আপনার মতামত লিখুন