মামলা দায়েরের প্রায় একযুগ পরে রংপুরে বহুল আলোচিত সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎস হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালত। রায়ে রুবেল ওরফে হেকরমকে মৃত্যুদণ্ড এবং এলিন ও শুভ কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় অপর তিন আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আসামিদের অনুপস্থিতিতে রংপুর মহানগর দায়রা জজ মশিয়ুর রহমান খান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় ছিল ব্যাপক কৌতূহল ও উৎসুক মানুষের ভিড়।
আদালত সূত্র ও মামলার বিবরণে জানা গেছে, রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগের আলো পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার মশিউর রহমান উৎস পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মাদক কারবারের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরাগীগঞ্জ এলাকার মাদক কারবারি জহিরন আকতার জুইয়ের বিরুদ্ধে মাদক কারবার নিয়ে তার করা কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ক্ষুব্ধ হন জুই। তাই মাদক কারবারিদের টার্গেটে পড়েন সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎস।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সাংবাদিক উৎসকে হত্যার জন্য জুই আসামিদের সাড়ে ৩ লাখ টাকায় ভাড়া করেন। ঘটনার দিন মাগরিবের নামাজের পর উৎস বাসা থেকে রংপুর নগরীর জিএল রায় রোডস্থ দৈনিক যুগের আলো পত্রিকা অফিসে আসেন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরাগীগঞ্জ এলাকার পূর্বপরিচিত রুবেল তাকে তার ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। সাংবাদিক উৎস কাজ শেষ করে রাত ৯টার দিকে সেখানে যাওয়ার কথা জানান।
পরে তিনি বৈরাগীগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দাওয়াত খেয়ে ফেরার পথে আসামিদের হামলার শিকার হন। আসামিরা তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এরপর তার লাশ সড়কের পাশে নগরীর ধর্মদাস এলাকার গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে হত্যাকারীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিক উৎসের লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।
এ ঘটনায় নিহত সাংবাদিক উৎসের মা নুরজাহান বেগম বাদী হয়ে মাদক কারবারি জহিরন আকতার জুইকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা তদন্তের সময় পুলিশ এলিন নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করে। পরে তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তদন্ত শেষে পুলিশ ছয় আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় রংপুর মহানগর দায়রা জজ মশিয়ুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে রুবেল ওরফে হেকরমকে মৃত্যুদণ্ড, এলিন ও শুভ কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার পর মামলার বাদী নুর জাহান বেগম বলেন, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হাদী বেলাল ও বাদীপক্ষের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ জানান, মামলার মূল অভিযুক্ত জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদি তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে সাংবাদিক উৎস রহমানকে হত্যা করিয়েছে, অথচ আদালত হত্যাকাণ্ডের সেই মাস্টার মাইন্ডকেই বেকসুর খালাস দিয়েছে। এ রায়ে আমরা আইনজীবীসহ নিহতের পরিবার সংক্ষুব্ধ। এ মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। এভাবে হত্যার পর মূলহোতা পার পেয়ে গেলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে। সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎস হত্যা মামলায় আমরা প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার পাইনি।
দীর্ঘ এক যুগের কাছাকাছি সময় ধরে চলা এ মামলার রায়ে সাংবাদিক মহল ও নিহতের পরিবারের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বিষয় : রংপুরের খবর সাংবাদিক হত্যা

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মামলা দায়েরের প্রায় একযুগ পরে রংপুরে বহুল আলোচিত সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎস হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালত। রায়ে রুবেল ওরফে হেকরমকে মৃত্যুদণ্ড এবং এলিন ও শুভ কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় অপর তিন আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আসামিদের অনুপস্থিতিতে রংপুর মহানগর দায়রা জজ মশিয়ুর রহমান খান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় ছিল ব্যাপক কৌতূহল ও উৎসুক মানুষের ভিড়।
আদালত সূত্র ও মামলার বিবরণে জানা গেছে, রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগের আলো পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার মশিউর রহমান উৎস পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মাদক কারবারের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরাগীগঞ্জ এলাকার মাদক কারবারি জহিরন আকতার জুইয়ের বিরুদ্ধে মাদক কারবার নিয়ে তার করা কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ক্ষুব্ধ হন জুই। তাই মাদক কারবারিদের টার্গেটে পড়েন সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎস।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সাংবাদিক উৎসকে হত্যার জন্য জুই আসামিদের সাড়ে ৩ লাখ টাকায় ভাড়া করেন। ঘটনার দিন মাগরিবের নামাজের পর উৎস বাসা থেকে রংপুর নগরীর জিএল রায় রোডস্থ দৈনিক যুগের আলো পত্রিকা অফিসে আসেন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরাগীগঞ্জ এলাকার পূর্বপরিচিত রুবেল তাকে তার ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। সাংবাদিক উৎস কাজ শেষ করে রাত ৯টার দিকে সেখানে যাওয়ার কথা জানান।
পরে তিনি বৈরাগীগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দাওয়াত খেয়ে ফেরার পথে আসামিদের হামলার শিকার হন। আসামিরা তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এরপর তার লাশ সড়কের পাশে নগরীর ধর্মদাস এলাকার গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে হত্যাকারীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিক উৎসের লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।
এ ঘটনায় নিহত সাংবাদিক উৎসের মা নুরজাহান বেগম বাদী হয়ে মাদক কারবারি জহিরন আকতার জুইকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা তদন্তের সময় পুলিশ এলিন নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করে। পরে তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তদন্ত শেষে পুলিশ ছয় আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় রংপুর মহানগর দায়রা জজ মশিয়ুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে রুবেল ওরফে হেকরমকে মৃত্যুদণ্ড, এলিন ও শুভ কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার পর মামলার বাদী নুর জাহান বেগম বলেন, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হাদী বেলাল ও বাদীপক্ষের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ জানান, মামলার মূল অভিযুক্ত জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদি তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে সাংবাদিক উৎস রহমানকে হত্যা করিয়েছে, অথচ আদালত হত্যাকাণ্ডের সেই মাস্টার মাইন্ডকেই বেকসুর খালাস দিয়েছে। এ রায়ে আমরা আইনজীবীসহ নিহতের পরিবার সংক্ষুব্ধ। এ মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। এভাবে হত্যার পর মূলহোতা পার পেয়ে গেলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে। সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎস হত্যা মামলায় আমরা প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার পাইনি।
দীর্ঘ এক যুগের কাছাকাছি সময় ধরে চলা এ মামলার রায়ে সাংবাদিক মহল ও নিহতের পরিবারের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন