ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নে একই পরিবারের নামে দুটি পৃথক ওয়ারিশান সনদ ইস্যু নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। একটি সনদে চার ছেলে ও তিন মেয়ের নাম থাকলেও পরবর্তী সনদে পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় সনদে আজগর আলী নামে একজনকে মৃত দেখানো হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তি নিজেকে আজগর আলী ওরফে আজিজুর রহমান দাবি করে জীবিত থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁকে মৃত দেখিয়ে ইস্যু করা সনদ ব্যবহার করে জমি নিজেদের নামে খারিজ করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্যানেল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া সনদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
দুটি ওয়ারিশান সনদ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত কুমার বর্মন ভুবন আলীর নামে একটি সনদ ইস্যু করেন। এতে চার ছেলে ও তিন মেয়ের নাম উল্লেখ ছিল। পরে ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সিমলা রানী একই পরিবারের নামে আরেকটি সনদ ইস্যু করেন। এতে পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের নাম রয়েছে। নতুন সনদে আজগর আলী নামে একজনকে মৃত উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী আজিজুর রহমানের দাবি, আজগর আলী ওরফে আজিজুর রহমান তাঁরই নাম। তিনি ওই পরিবারের বড় ছেলে। তাঁর তিন বোনের মধ্যে বড় বোন হাজেরা বেগম মারা গেছেন এবং বাকি দুই বোন জীবিত। তাঁর চার ভাইয়ের নাম আনোয়ারুল হক, মাশারুল হক, আমিরুল ইসলাম ও তিনি নিজে। তাঁর দাবি, আজগর আলী নামে আলাদা কোনো ভাই নেই। তাঁর নামের একটি অংশ ব্যবহার করে পৃথক পরিচয় তৈরি করে তাঁকে মৃত দেখানো হয়েছে।
আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমি আজগর আলী ওরফে আজিজুর রহমান। এখনো জীবিত ও সুস্থ আছি। অথচ আমার নামের একটি অংশ ব্যবহার করে আজগর আলী নামে আরেকজনের পরিচয় দেখানো হয়েছে। সেই সনদ ব্যবহার করে আমার নামে কেনা জমি নিজেদের নামে খারিজ করে নিয়েছেন আমার ভাইয়েরা।’
তিনি আরও জানান, তাঁর বাবা গোলাম রসুল তাঁর নামে জমি কিনেছিলেন। পরে বাবা জীবদ্দশায় ওই জমি শুক্রা শীলের কাছে বিক্রি করেন। জমিটি পৈতৃক সম্পত্তি নয় বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিষয়টি জানার পর তিনি প্যানেল চেয়ারম্যান সিমলা রানীকে নিজের জীবিত থাকার কথা জানান। পরে প্যানেল চেয়ারম্যান তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে জীবিত দেখেন এবং সনদ সংশোধনের আশ্বাস দেন। তবে এখনো সনদ সংশোধন করা হয়নি। যোগাযোগ করলে বারবার ‘আজ করব, কাল করব’ বলে সময় দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, তাঁর তিন ভাই আনোয়ারুল হক, মাশারুল হক ও আমিরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা পাঁচ ভাই ছিলেন। তাঁদের এক ভাই আজগর আলী শৈশবে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স আনুমানিক ৯ থেকে ১০ বছর ছিল। আজিজুর রহমানের অভিযোগ সত্য নয় বলেও দাবি করেন তাঁরা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ছোটবেলা থেকে তাঁরা ওই পরিবারকে চার ছেলে ও তিন মেয়ের পরিবার হিসেবেই জানেন। সম্প্রতি পাঁচ ছেলে থাকার কথা শুনেছেন। আজগর আলী ওরফে আজিজুর রহমান নামে একজনকেই তাঁরা চেনেন এবং তাঁকে জীবিত দেখেছেন। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে মৃত দেখানো হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।
আকচা ইউনিয়ন (পূর্ব) বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব বলেন, ছোটবেলা থেকেই ওই পরিবারে চার ভাই ও তিন বোন বলে জানেন তিনি। এখন পাঁচ ভাইয়ের কথা শুনছেন। প্যানেল চেয়ারম্যানও আগে পরিবারটিতে চার ছেলে ও তিন মেয়ে থাকার বিষয়টি জানতেন। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই নতুন সনদ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি জানার পর সনদ সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বিজয় চন্দ্র বলেন, আগের চেয়ারম্যানের দেওয়া ওয়ারিশান সনদের বিষয়ে তিনি জানেন। তবে প্যানেল চেয়ারম্যান নতুন করে আরেকটি সনদ দিয়েছেন, তা তাঁর জানা ছিল না। তাঁর ভাষ্য, ‘আজগর আলী আর আজিজুর রহমান একই ব্যক্তি। তিনি এখনো জীবিত রয়েছেন।’
এ বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান সিমলা রানী বলেন, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আজগর আলী নামে একজন জীবিত ব্যক্তি রয়েছেন। তাঁর পরিবারের সদস্য ও ভাইয়েরা তাঁর কাছে এসে ওয়ারিশান সনদ নিয়েছেন। তাঁরা একটি মৃত্যু সনদও সঙ্গে এনেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, ওই পরিবারে আজগর আলী নামে চার ভাই রয়েছেন। তবে আবেদনে পাঁচ ভাইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তিনিও এখনো সন্দিহান রয়েছেন বলে জানান তিনি।
বিষয় : ঠাকুরগাঁও সংবাদ জুফাস অনুসন্ধান

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নে একই পরিবারের নামে দুটি পৃথক ওয়ারিশান সনদ ইস্যু নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। একটি সনদে চার ছেলে ও তিন মেয়ের নাম থাকলেও পরবর্তী সনদে পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় সনদে আজগর আলী নামে একজনকে মৃত দেখানো হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তি নিজেকে আজগর আলী ওরফে আজিজুর রহমান দাবি করে জীবিত থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁকে মৃত দেখিয়ে ইস্যু করা সনদ ব্যবহার করে জমি নিজেদের নামে খারিজ করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্যানেল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া সনদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
দুটি ওয়ারিশান সনদ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত কুমার বর্মন ভুবন আলীর নামে একটি সনদ ইস্যু করেন। এতে চার ছেলে ও তিন মেয়ের নাম উল্লেখ ছিল। পরে ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সিমলা রানী একই পরিবারের নামে আরেকটি সনদ ইস্যু করেন। এতে পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের নাম রয়েছে। নতুন সনদে আজগর আলী নামে একজনকে মৃত উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী আজিজুর রহমানের দাবি, আজগর আলী ওরফে আজিজুর রহমান তাঁরই নাম। তিনি ওই পরিবারের বড় ছেলে। তাঁর তিন বোনের মধ্যে বড় বোন হাজেরা বেগম মারা গেছেন এবং বাকি দুই বোন জীবিত। তাঁর চার ভাইয়ের নাম আনোয়ারুল হক, মাশারুল হক, আমিরুল ইসলাম ও তিনি নিজে। তাঁর দাবি, আজগর আলী নামে আলাদা কোনো ভাই নেই। তাঁর নামের একটি অংশ ব্যবহার করে পৃথক পরিচয় তৈরি করে তাঁকে মৃত দেখানো হয়েছে।
আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমি আজগর আলী ওরফে আজিজুর রহমান। এখনো জীবিত ও সুস্থ আছি। অথচ আমার নামের একটি অংশ ব্যবহার করে আজগর আলী নামে আরেকজনের পরিচয় দেখানো হয়েছে। সেই সনদ ব্যবহার করে আমার নামে কেনা জমি নিজেদের নামে খারিজ করে নিয়েছেন আমার ভাইয়েরা।’
তিনি আরও জানান, তাঁর বাবা গোলাম রসুল তাঁর নামে জমি কিনেছিলেন। পরে বাবা জীবদ্দশায় ওই জমি শুক্রা শীলের কাছে বিক্রি করেন। জমিটি পৈতৃক সম্পত্তি নয় বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিষয়টি জানার পর তিনি প্যানেল চেয়ারম্যান সিমলা রানীকে নিজের জীবিত থাকার কথা জানান। পরে প্যানেল চেয়ারম্যান তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে জীবিত দেখেন এবং সনদ সংশোধনের আশ্বাস দেন। তবে এখনো সনদ সংশোধন করা হয়নি। যোগাযোগ করলে বারবার ‘আজ করব, কাল করব’ বলে সময় দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, তাঁর তিন ভাই আনোয়ারুল হক, মাশারুল হক ও আমিরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা পাঁচ ভাই ছিলেন। তাঁদের এক ভাই আজগর আলী শৈশবে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স আনুমানিক ৯ থেকে ১০ বছর ছিল। আজিজুর রহমানের অভিযোগ সত্য নয় বলেও দাবি করেন তাঁরা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ছোটবেলা থেকে তাঁরা ওই পরিবারকে চার ছেলে ও তিন মেয়ের পরিবার হিসেবেই জানেন। সম্প্রতি পাঁচ ছেলে থাকার কথা শুনেছেন। আজগর আলী ওরফে আজিজুর রহমান নামে একজনকেই তাঁরা চেনেন এবং তাঁকে জীবিত দেখেছেন। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে মৃত দেখানো হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।
আকচা ইউনিয়ন (পূর্ব) বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব বলেন, ছোটবেলা থেকেই ওই পরিবারে চার ভাই ও তিন বোন বলে জানেন তিনি। এখন পাঁচ ভাইয়ের কথা শুনছেন। প্যানেল চেয়ারম্যানও আগে পরিবারটিতে চার ছেলে ও তিন মেয়ে থাকার বিষয়টি জানতেন। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই নতুন সনদ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি জানার পর সনদ সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বিজয় চন্দ্র বলেন, আগের চেয়ারম্যানের দেওয়া ওয়ারিশান সনদের বিষয়ে তিনি জানেন। তবে প্যানেল চেয়ারম্যান নতুন করে আরেকটি সনদ দিয়েছেন, তা তাঁর জানা ছিল না। তাঁর ভাষ্য, ‘আজগর আলী আর আজিজুর রহমান একই ব্যক্তি। তিনি এখনো জীবিত রয়েছেন।’
এ বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান সিমলা রানী বলেন, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আজগর আলী নামে একজন জীবিত ব্যক্তি রয়েছেন। তাঁর পরিবারের সদস্য ও ভাইয়েরা তাঁর কাছে এসে ওয়ারিশান সনদ নিয়েছেন। তাঁরা একটি মৃত্যু সনদও সঙ্গে এনেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, ওই পরিবারে আজগর আলী নামে চার ভাই রয়েছেন। তবে আবেদনে পাঁচ ভাইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তিনিও এখনো সন্দিহান রয়েছেন বলে জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন