কীটনাশক বা বালাইনাশকের পেছনে অতিরিক্ত টাকা ঢালার দিন এখন অতীত। রংপুরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে রোপা আমন ক্ষেতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে এখন বিপ্লব ঘটিয়েছে পরিবেশবান্ধব ও সম্পূর্ণ সাশ্রয়ী ‘পার্চিং’ পদ্ধতি। ক্ষেতের মাঝখানে পাখি বসার ছোট একটি ব্যবস্থা করেই প্রাকৃতিকভাবে ক্ষেতের শত্রু পোকা দমন করছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। এর ফলে একদিকে যেমন কীটনাশক কেনার খরচ কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ, অন্যদিকে বেঁচে গেছে প্রকৃতি ও পরিবেশ।
চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মাঠের ফসল দেখতে দারুণ সতেজ ও সবুজ। কৃষি বিভাগ আশা প্রকাশ করেছে, শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া ঠিক থাকলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। আর এই সফলতার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে আধুনিক অথচ প্রকৃতিসম্মত পার্চিং পদ্ধতি।
পরিসংখ্যান বলছে, এবার জেলার মোট আবাদি জমির প্রায় ৮৮ শতাংশ—অর্থাৎ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতেই এই পদ্ধতি সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ধইঞ্চা গাছ লাগিয়ে ‘লাইভ পার্চিং’ এবং ১ লাখ ৩১ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে গাছের ডাল, বাঁশ ও কঞ্চি পুঁতে ‘ডেড পার্চিং’-এর মাধ্যমে পাখি বসার স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কার্যপ্রণালী অত্যন্ত সহজ। জমির মাঝে পুঁতে দেওয়া ডাল কিংবা ধইঞ্চা গাছের ওপর এসে বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি ও দোয়েলের মতো পোকাখেকো পাখি। এরপর ধানের প্রধান শত্রু—মাজরা, পাতা মোড়ানো, চুঙ্গি ও লেদা পোকার মথ বা কীড়াগুলো নিখুঁতভাবে ধরে খেয়ে ফেলে তারা। এতে কোনো কেমিক্যালের বালাই ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবেই নির্মূল হয় ফসলের পোকা। এমনকি পাখিদের বিষ্ঠা জমিতে জৈব সার হিসেবে জমা হয়ে মাটির উর্বরতা শক্তিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কাউনিয়া, মিঠাপুকুর কিংবা সদর উপজেলার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া সোনালী ও সবুজ ধানের শীষের সমারোহের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা পার্চিংগুলোতে অনবরত চলছে পাখিদের পোকা শিকারের উৎসব। স্থানীয় কৃষক নাছির উদ্দিন, শাহজাহান মন্ডল ও রতন চন্দ্ররা জানান, কোনো খরচ ছাড়াই পোকা দমন করা সম্ভব হওয়ায় এখন আর আগের মতো ক্ষতিকর কীটনাশকের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ মো. সাইফুল আলম জানান, কৃষকদের মুখে এখন দারুণ স্বস্তির হাসি। জেলার আটটি উপজেলাতেই এই পদ্ধতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ায় কীটনাশক বাবদ খরচ কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বাম্পার ফলন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই সবুজ বিপ্লব কৃষিক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।
বিষয় : রংপুরের খবর কৃষি

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
কীটনাশক বা বালাইনাশকের পেছনে অতিরিক্ত টাকা ঢালার দিন এখন অতীত। রংপুরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে রোপা আমন ক্ষেতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে এখন বিপ্লব ঘটিয়েছে পরিবেশবান্ধব ও সম্পূর্ণ সাশ্রয়ী ‘পার্চিং’ পদ্ধতি। ক্ষেতের মাঝখানে পাখি বসার ছোট একটি ব্যবস্থা করেই প্রাকৃতিকভাবে ক্ষেতের শত্রু পোকা দমন করছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। এর ফলে একদিকে যেমন কীটনাশক কেনার খরচ কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ, অন্যদিকে বেঁচে গেছে প্রকৃতি ও পরিবেশ।
চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মাঠের ফসল দেখতে দারুণ সতেজ ও সবুজ। কৃষি বিভাগ আশা প্রকাশ করেছে, শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া ঠিক থাকলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। আর এই সফলতার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে আধুনিক অথচ প্রকৃতিসম্মত পার্চিং পদ্ধতি।
পরিসংখ্যান বলছে, এবার জেলার মোট আবাদি জমির প্রায় ৮৮ শতাংশ—অর্থাৎ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতেই এই পদ্ধতি সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ধইঞ্চা গাছ লাগিয়ে ‘লাইভ পার্চিং’ এবং ১ লাখ ৩১ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে গাছের ডাল, বাঁশ ও কঞ্চি পুঁতে ‘ডেড পার্চিং’-এর মাধ্যমে পাখি বসার স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কার্যপ্রণালী অত্যন্ত সহজ। জমির মাঝে পুঁতে দেওয়া ডাল কিংবা ধইঞ্চা গাছের ওপর এসে বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি ও দোয়েলের মতো পোকাখেকো পাখি। এরপর ধানের প্রধান শত্রু—মাজরা, পাতা মোড়ানো, চুঙ্গি ও লেদা পোকার মথ বা কীড়াগুলো নিখুঁতভাবে ধরে খেয়ে ফেলে তারা। এতে কোনো কেমিক্যালের বালাই ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবেই নির্মূল হয় ফসলের পোকা। এমনকি পাখিদের বিষ্ঠা জমিতে জৈব সার হিসেবে জমা হয়ে মাটির উর্বরতা শক্তিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কাউনিয়া, মিঠাপুকুর কিংবা সদর উপজেলার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া সোনালী ও সবুজ ধানের শীষের সমারোহের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা পার্চিংগুলোতে অনবরত চলছে পাখিদের পোকা শিকারের উৎসব। স্থানীয় কৃষক নাছির উদ্দিন, শাহজাহান মন্ডল ও রতন চন্দ্ররা জানান, কোনো খরচ ছাড়াই পোকা দমন করা সম্ভব হওয়ায় এখন আর আগের মতো ক্ষতিকর কীটনাশকের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ মো. সাইফুল আলম জানান, কৃষকদের মুখে এখন দারুণ স্বস্তির হাসি। জেলার আটটি উপজেলাতেই এই পদ্ধতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ায় কীটনাশক বাবদ খরচ কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বাম্পার ফলন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই সবুজ বিপ্লব কৃষিক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

আপনার মতামত লিখুন