ভোর হলেই ঠাকুরগাঁও শহরের বাসস্ট্যান্ড গোলচত্বরে বসে শ্রমের হাট। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দিনমজুরেরা এখানে আসেন কাজের আশায়। কারও হাতে কোদাল-কর্নি, কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি-কাস্তে। কেউ আবার রং-চুনকামের সরঞ্জাম নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু ক্রেতা নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে।
কৃষিকাজ, নির্মাণ, মাটি কাটা, রং-চুনকামসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রম বিক্রি করে যাঁদের সংসার চলে, তাঁদের কেউ কয়েক দিন, কেউবা কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ পাচ্ছেন না। কাজের সন্ধানে প্রতিদিন হাটে এসে বসছেন, আবার দিন শেষে ফিরছেন হতাশ হয়ে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন অনেক শ্রমিক। সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকে কাজ পাননি। কারও চোখে অনিশ্চয়তা, কারও মুখে সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা।
৬২ বছর বয়সী আব্বাস আলী গত দুই মাস ধরে এই হাটে আসছেন। তাঁর ভাষ্য, এ সময়ে এক দিনও কাজ পাননি। তিনি বলেন, ‘দেখেন, গত দুই মাস ধরে আমি কোনো কাজ পাচ্ছি না। আজও যদি কাজ না পাই, তাহলে বাড়িতে আমার পরিবারের না খেয়ে থাকতে হবে। আমাদের আর কোনো উপায় নেই। পরিস্থিতি খুবই খারাপ।’
শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের শিবরামপুর থেকে কাজের জন্য আসেন নিপুন চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ‘আমি দিনমজুরের কাজ করি। কিন্তু এখন কাজের মন্দা চলছে। এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই, তাই আমাদের খুব কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে। ঋণ করে আমাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে।’
শাহেদ হোসেনের বাবা মারা গেছেন ১৫ থেকে ২০ দিন আগে। এরপর তাঁর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে মাত্র ছয় দিন কাজ পেয়েছেন তিনি। তিন মেয়ের বাবা শাহেদ বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করতে করতে আমি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে গেছি। আর আজও যদি খালি হাতে বাড়ি ফিরি, তাহলে আমার পরিবারের খাওয়ার মতো কিছুই থাকবে না।’
সংসারের টানাপোড়েনের পাশাপাশি মেয়েদের পড়াশোনার খরচ নিয়েও দুশ্চিন্তায় শাহেদ। তিনি বলেন, ‘আমার তিনটি মেয়ে। তাদের পড়াশোনার খরচও দিতে পারছি না। কাজ নেই, এখন কাজের মন্দা চলছে। আমি কী করব? ... গতকাল থেকে বাড়িতে ভাত খাইনি।’
সদর উপজেলার আদর্শ কলোনি বাঙালিপাড়া থেকে আসা মজনু মিয়া ১৮ দিন ধরে এই হাটে আসছেন। তাঁর দাবি, এ সময়ে এক দিনও কাজ পাননি। আট সদস্যের সংসার তাঁর। মজনু বলেন, ‘আমরা পেটের দায়ে, কাজ করার জন্য এই স্ট্যান্ডে আসি। কিন্তু কাজ পাই না। এক দিন কাজ হলে পরের দুই দিন কাজ থাকে না। বর্তমানে তো কাজই নেই। এভাবে আমার সংসার চলবে কীভাবে?’
চিকিৎসা ও সংসারের খরচ নিয়েও সমস্যার কথা জানান মজনু। তিনি বলেন, ‘ছেলে-সন্তানের অসুখ-বিসুখ হয়, কিন্তু চিকিৎসা করার মতো পয়সা-কড়ি নেই। ... ১৮ দিন ধরে ঘুরছি, কিন্তু একটা টাকাও ইনকাম করতে পারিনি। বরং প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় পকেট থেকে আরও ১০-২০ টাকা করে খরচ হয়ে যাচ্ছে।’
ভাদাই এলাকা থেকে আসা মোহাম্মদ আলী চার-পাঁচ দিন ধরে কাজ পাননি। বড় খোঁচা বাড়ি থেকে আসা ভবেশ চন্দ্রও প্রায় এক মাস ধরে কাজের সন্ধানে ঘুরছেন। ভবেশ বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে, গেরস্তরা আসে না। আজ সকাল থেকে বসে আছি, এখন পর্যন্ত একটা গেরস্তও আসেনি। কে লোক নেবে, কে খাটাবে? ... বউ-বাচ্চা নিয়ে কী খাব? সংসারের বাজারখরচই তো এখন চালাতে পারছি না।’
স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধান কাটার ও ধান রোপণের মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে কৃষিকাজের সুযোগ কমে গেছে। ফলে দিনমজুরদের একটি অংশ বিকল্প কাজের আশায় এই শ্রমের হাটে আসছেন। তবে বর্তমানে শ্রমের চাহিদা কম থাকায় তাঁদের অনেকেই কাজ পাচ্ছেন না।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হকও বিষয়টিকে একটি সংকট হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘এটা আসলে একটা ক্রাইসিস। এখন মনে হচ্ছে কাজ নেই। ধান তো এখন মাঝপথে আছে। এই মুহূর্তে ধান কাটারও মৌসুম নয়, আবার লাগানোরও মৌসুম নয়। মাঝখানের এই সময়টাতে তাঁরা একটা সংকটে পড়েছেন।’
শ্রমের হাটে প্রতিদিন কাজের আশায় আসা মানুষগুলোর কাছে দিনের শুরুটা তাই এখন আর নতুন কাজের প্রত্যাশা নয়; বরং খালি হাতে বাড়ি ফেরার ভয়। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আপনারা বিষয়টি আমার নজরে এনেছেন, এ জন্য ধন্যবাদ। আমি বিষয়টি নিয়ে কালকে একটু চিন্তা করে দেখি, কিছু করা যায় কি না।’
বিষয় : ঠাকুরগাঁও সংবাদ শ্রমিক

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬
ভোর হলেই ঠাকুরগাঁও শহরের বাসস্ট্যান্ড গোলচত্বরে বসে শ্রমের হাট। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দিনমজুরেরা এখানে আসেন কাজের আশায়। কারও হাতে কোদাল-কর্নি, কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি-কাস্তে। কেউ আবার রং-চুনকামের সরঞ্জাম নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু ক্রেতা নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে।
কৃষিকাজ, নির্মাণ, মাটি কাটা, রং-চুনকামসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রম বিক্রি করে যাঁদের সংসার চলে, তাঁদের কেউ কয়েক দিন, কেউবা কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ পাচ্ছেন না। কাজের সন্ধানে প্রতিদিন হাটে এসে বসছেন, আবার দিন শেষে ফিরছেন হতাশ হয়ে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন অনেক শ্রমিক। সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকে কাজ পাননি। কারও চোখে অনিশ্চয়তা, কারও মুখে সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা।
৬২ বছর বয়সী আব্বাস আলী গত দুই মাস ধরে এই হাটে আসছেন। তাঁর ভাষ্য, এ সময়ে এক দিনও কাজ পাননি। তিনি বলেন, ‘দেখেন, গত দুই মাস ধরে আমি কোনো কাজ পাচ্ছি না। আজও যদি কাজ না পাই, তাহলে বাড়িতে আমার পরিবারের না খেয়ে থাকতে হবে। আমাদের আর কোনো উপায় নেই। পরিস্থিতি খুবই খারাপ।’
শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের শিবরামপুর থেকে কাজের জন্য আসেন নিপুন চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ‘আমি দিনমজুরের কাজ করি। কিন্তু এখন কাজের মন্দা চলছে। এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই, তাই আমাদের খুব কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে। ঋণ করে আমাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে।’
শাহেদ হোসেনের বাবা মারা গেছেন ১৫ থেকে ২০ দিন আগে। এরপর তাঁর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে মাত্র ছয় দিন কাজ পেয়েছেন তিনি। তিন মেয়ের বাবা শাহেদ বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করতে করতে আমি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে গেছি। আর আজও যদি খালি হাতে বাড়ি ফিরি, তাহলে আমার পরিবারের খাওয়ার মতো কিছুই থাকবে না।’
সংসারের টানাপোড়েনের পাশাপাশি মেয়েদের পড়াশোনার খরচ নিয়েও দুশ্চিন্তায় শাহেদ। তিনি বলেন, ‘আমার তিনটি মেয়ে। তাদের পড়াশোনার খরচও দিতে পারছি না। কাজ নেই, এখন কাজের মন্দা চলছে। আমি কী করব? ... গতকাল থেকে বাড়িতে ভাত খাইনি।’
সদর উপজেলার আদর্শ কলোনি বাঙালিপাড়া থেকে আসা মজনু মিয়া ১৮ দিন ধরে এই হাটে আসছেন। তাঁর দাবি, এ সময়ে এক দিনও কাজ পাননি। আট সদস্যের সংসার তাঁর। মজনু বলেন, ‘আমরা পেটের দায়ে, কাজ করার জন্য এই স্ট্যান্ডে আসি। কিন্তু কাজ পাই না। এক দিন কাজ হলে পরের দুই দিন কাজ থাকে না। বর্তমানে তো কাজই নেই। এভাবে আমার সংসার চলবে কীভাবে?’
চিকিৎসা ও সংসারের খরচ নিয়েও সমস্যার কথা জানান মজনু। তিনি বলেন, ‘ছেলে-সন্তানের অসুখ-বিসুখ হয়, কিন্তু চিকিৎসা করার মতো পয়সা-কড়ি নেই। ... ১৮ দিন ধরে ঘুরছি, কিন্তু একটা টাকাও ইনকাম করতে পারিনি। বরং প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় পকেট থেকে আরও ১০-২০ টাকা করে খরচ হয়ে যাচ্ছে।’
ভাদাই এলাকা থেকে আসা মোহাম্মদ আলী চার-পাঁচ দিন ধরে কাজ পাননি। বড় খোঁচা বাড়ি থেকে আসা ভবেশ চন্দ্রও প্রায় এক মাস ধরে কাজের সন্ধানে ঘুরছেন। ভবেশ বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে, গেরস্তরা আসে না। আজ সকাল থেকে বসে আছি, এখন পর্যন্ত একটা গেরস্তও আসেনি। কে লোক নেবে, কে খাটাবে? ... বউ-বাচ্চা নিয়ে কী খাব? সংসারের বাজারখরচই তো এখন চালাতে পারছি না।’
স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধান কাটার ও ধান রোপণের মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে কৃষিকাজের সুযোগ কমে গেছে। ফলে দিনমজুরদের একটি অংশ বিকল্প কাজের আশায় এই শ্রমের হাটে আসছেন। তবে বর্তমানে শ্রমের চাহিদা কম থাকায় তাঁদের অনেকেই কাজ পাচ্ছেন না।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হকও বিষয়টিকে একটি সংকট হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘এটা আসলে একটা ক্রাইসিস। এখন মনে হচ্ছে কাজ নেই। ধান তো এখন মাঝপথে আছে। এই মুহূর্তে ধান কাটারও মৌসুম নয়, আবার লাগানোরও মৌসুম নয়। মাঝখানের এই সময়টাতে তাঁরা একটা সংকটে পড়েছেন।’
শ্রমের হাটে প্রতিদিন কাজের আশায় আসা মানুষগুলোর কাছে দিনের শুরুটা তাই এখন আর নতুন কাজের প্রত্যাশা নয়; বরং খালি হাতে বাড়ি ফেরার ভয়। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আপনারা বিষয়টি আমার নজরে এনেছেন, এ জন্য ধন্যবাদ। আমি বিষয়টি নিয়ে কালকে একটু চিন্তা করে দেখি, কিছু করা যায় কি না।’

আপনার মতামত লিখুন